শেখারশিল্প
বর্তমান থেকে সামনে ঠেলবেন না। লক্ষ্য থেকে পেছনে হাঁটুন।
কল্পনা করুন সেই আদর্শ মানুষকে, যে লক্ষ্যটা নিশ্চিতভাবে অর্জন করবে। তারপর নিজেকে সেই মানুষে পরিণত করুন।
লক্ষ্য ঠিক করার প্রচলিত নিয়মটা আমরা সবাই জানি।
"এই সেমিস্টারে GPA ৩.৮ চাই।" তারপর একটা তালিকা — প্রতিদিন এত ঘণ্টা, এত অধ্যায়, এত রিভিশন।
আর তিন সপ্তাহ পর তালিকাটা কোথায় হারিয়ে যায়, কেউ জানে না।
কেন?
কারণ আপনি ঠিক করেছিলেন "কী করব"। ঠিক করেননি "কে হব"।
কাজের তালিকা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আপনি আগের মানুষটাই থেকে যান — আর আগের মানুষটা তো এই লক্ষ্যে পৌঁছায়নি, তাই না?
Reverse Goal Setting এই জায়গাটাই বদলে দেয়।
মূল ধারণা: উল্টো দিক থেকে শুরু করুন
বর্তমান অবস্থা থেকে সামনে ঠেলার বদলে লক্ষ্য থেকে শুরু করুন।
কল্পনা করুন সেই আদর্শ মানুষটাকে — যে এই লক্ষ্যটা নিশ্চিতভাবে অর্জন করবে। তার অভ্যাস কেমন? সে কীভাবে পড়ে? সে সকালে উঠে কী করে? সে চাপে পড়লে কী করে?
তারপর নিজেকে ধীরে ধীরে সেই মানুষে পরিণত করুন।
লক্ষ্য অর্জন তখন আর একটা যুদ্ধ থাকে না। ওটা হয়ে যায় পরিণতি।
পাঁচ ধাপ
ধাপ ১ — অন্তত ছয়-নয় মাস দূরের একটা লক্ষ্য ঠিক করুন
কেন এত দূরে? কারণ কাছের লক্ষ্য কাজের তালিকা বানায়, দূরের লক্ষ্য মানুষ বদলায়। আর মানুষ বদলাতে সময় লাগে।
ধাপ ২ — আদর্শ মানুষের গুণাবলি ১০-এ নম্বর দিন
সেই আদর্শ মানুষটার গুণগুলো তালিকা করুন — মনোযোগ, ধারাবাহিকতা, নোট নেওয়ার দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, চাপ সামলানো, যা যা প্রাসঙ্গিক।
প্রতিটার পাশে ১০-এ নম্বর দিন — এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটা কতটা জরুরি? আর পাশে ছোট করে মন্তব্য লিখুন, কেন।
ধাপ ৩ — একই উপাদানে নিজেকে নম্বর দিন
এবার একই তালিকায় নিজেকে নম্বর দিন। সৎভাবে।
দুটো কলামের পার্থক্যটাই আপনার আসল পথ। যেখানে ফারাক সবচেয়ে বড়, ওখান থেকেই শুরু।
ধাপ ৪ — Force field analysis
আপনার চারপাশে দুই ধরনের শক্তি আছে —
বাধা: কী কী আপনাকে পিছিয়ে দিচ্ছে? সম্পদ: আপনার হাতে কী কী আছে? — বস্তুগত সম্পদ, সময়, অর্থ, আর মানুষ (এটা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়)।
দুটো তালিকা পাশাপাশি লিখুন। প্রায়ই দেখা যায়, আপনার হাতে যা আছে তার অর্ধেকও আপনি ব্যবহার করছেন না।
ধাপ ৫ — শুধু পরের পদক্ষেপের জন্য SMART পরিকল্পনা
এটা সবচেয়ে জরুরি ধাপ, আর সবচেয়ে বেশি ভুল হয় এখানেই।
পুরো ছয় মাসের বিস্তারিত পরিকল্পনা বানাবেন না। ওটা প্রথম বাধাতেই ভেঙে পড়বে।
শুধু পরের পদক্ষেপটার জন্য নির্দিষ্ট, মাপযোগ্য, সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা করুন। ওটা শেষ হলে পরেরটা।
বাস্তব সময়সীমা মানুন
এখানে কিছু সৎ হিসাব —
- একসাথে দুই-তিনটির বেশি উপাদান নিয়ে কাজ করবেন না।
- নিয়মিত থাকলে মাসে মোটামুটি এক নম্বর বাড়ে।
- তবে ওপরের দিকে গতি কমে যায় — ৪ থেকে ৫-এ যাওয়া সহজ, ৮ থেকে ৯-এ যাওয়া অনেক কঠিন। ১০-এ ১০ হতে বছরের পর বছর লাগে।
এটা জানা থাকলে হতাশা আসে না।
শুরুতে বাড়তি সময় দিন
লক্ষ্য সম্পর্কে আর নিজের সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন — কারণ এই দুটোই বাকি পুরো পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে।
আর একটা কাজের পরামর্শ: মানুষ কী বলে তার চেয়ে কী করে সেটা পর্যবেক্ষণ করুন। যিনি সফল, তার উপদেশের চেয়ে তার অভ্যাস বেশি শেখায়।
শুধু "ইচ্ছা" রাখবেন না
যদি না জানেন কীভাবে উন্নতি করবেন, তাহলে প্রথম কাজই হোক সেটা শেখা।
কারণ — সময় পার হওয়া নয়, সেই সময়ে আপনি কী করছেন সেটাই আসল পরিবর্তন আনে। ছয় মাস এমনিতেই কেটে যাবে; প্রশ্ন হলো ছয় মাস পর আপনি কোথায় থাকবেন।
আর প্রয়োজনে লক্ষ্য পুনর্বিবেচনা করুন
সময় কম পড়লে স্বল্পমেয়াদি ফলের পেছনে ছুটে দুই দিক থেকে ক্ষতি করবেন না। বরং ভিত্তিগত দক্ষতা গড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিন।
আর নিয়তটা ঠিক রাখুন। ইলম অর্জনের নিয়ত যদি শুধু নম্বর হয়, তাহলে নম্বর পেয়ে গেলে চেষ্টা থেমে যায়। নিয়ত যদি হয় উপকারী ইলম অর্জন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি — তাহলে পথটা সারাজীবনের হয়ে যায়।
আগামীকাল দিন ২২ — অসাধারণ উৎপাদনশীলতার তিন স্তম্ভ।
আজ একটা কাগজে দুটো কলাম আঁকুন — "আদর্শ মানুষ" আর "আমি"। পার্থক্যটাই আপনার রোডম্যাপ।
আল্লাহ আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন। আমিন।
লেখাটি "শেখার শিল্প" বইয়ের একটি অংশ নিয়ে। পুরো কাঠামো, বাকি অধ্যায় এবং ইলম, দোয়া ও রুকইয়াহ পর্বটি বইটিতে রয়েছে — বইটি দেখুন
পড়াশোনা ও শিক্ষার্থী — এই বিষয়ে আরও
গাইড ও প্রোটোকল
- আয়াতুল ইলম ওয়াল হিকমাহজ্ঞান ও প্রজ্ঞা-সংক্রান্ত আয়াতসমূহ — বাংলা অর্থসহ। আল কুরআন রুকইয়াহ হিলিং সেন্টার।
- মনোযোগ, অ্যাংজাইটি ও অকারণ ভয়অস্থিরতা, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ও একাগ্রতার রুকইয়াহ — আল কুরআন রুকইয়াহ হিলিং সেন্টার। রাকী ফয়সাল আহমেদ সাবিত…
PDF গাইড
- পরীক্ষায় সাফল্য ও পড়ার মনোযোগের দোয়াPDF · ১০ পৃষ্ঠা
- শিক্ষার্থীদের বদনজর ও মনোযোগের গাইডPDF · ৪ পৃষ্ঠা
- পড়াশোনা ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির আয়াতসমূহ (ইলম ও হিকমাহ)PDF · ১৫ পৃষ্ঠা
ব্লগ
- শেখার শিল্পপড়ালেখার আধুনিক বিজ্ঞান আর ইলম, দোয়া ও রুকইয়াহ — এক মলাটে
- ফ্ল্যাশকার্ড উল্টাচ্ছেন, Anki চালাচ্ছেন — তবু রেজাল্ট নড়ছে না?দোষটা আপনার অধ্যবসায়ের নয়। ব্যাখ্যাটা জানলে অনেক কিছু মিলে যাবে।
- হাইলাইটার কখনো শেখার জন্য তৈরিই হয়নি১৯৬৩ সালে এটি বানানো হয়েছিল একটি ডিজাইন টুল হিসেবে — বিজ্ঞাপনের শব্দ চোখে পড়ার মতো করতে।
আরও পড়ুন
১০ ঘণ্টা পড়লেন। শেখা হলো ১ ঘণ্টার।
যে হিসাবটা কেউ আপনাকে শেখায়নি — অথচ এটাই সব ঠিক করে দেয়।
আপনার আসল বাধাটা ঠিক কোথায়?
সবাই কৌশল খোঁজে। কিন্তু ভুল জায়গায় কৌশল লাগালে কিছুই বদলায় না।
সব ঠিক করছেন। তবু রেজাল্ট নড়ছে না কেন?
Anki চালাচ্ছেন, active recall করছেন, spaced repetition মানছেন — তবু আটকে আছেন।