← শেখার শিল্প — ৩০ দিন

১০ ঘণ্টা পড়লেন। শেখা হলো ১ ঘণ্টার।

শেখারশিল্পপড়ালেখাশিক্ষার্থীস্টাডিটিপসবই
১০ ঘণ্টা পড়লেন। শেখা হলো ১ ঘণ্টার।

আজ থেকে একটা সিরিজ শুরু করছি। ৩০ দিন, ৩০টা পোস্ট — প্রতিদিন একটা করে পূর্ণ টপিক, যেটা পড়েই আপনি আজ থেকে কাজে লাগাতে পারবেন।

শুরু করি সবচেয়ে জরুরি কথাটা দিয়ে।

আপনি রাত জেগে পড়েছেন। পাতা শেষ হয়েছে, দাগানো হয়েছে, নোটের খাতা ভরে গেছে। তবু পরীক্ষার হলে বসে ভেতরটা ফাঁকা লেগেছে।

আর তখনই মাথায় ওই কথাটা এসেছে — "আমার স্মৃতিশক্তি বোধহয় দুর্বল।" কিংবা "আমি বোধহয় যথেষ্ট খাটছি না।"

আমি নিজেও বছরের পর বছর এই কথাটা নিজেকে বলেছি। অনেক পরে বুঝেছি, কথাটা ভাবাই ভুল ছিল।

সমস্যাটা বুদ্ধিতে ছিল না। সমস্যাটা ছিল শেখার পদ্ধতিতে।

কারণ পড়া আর শেখা — এই দুটো এক জিনিস নয়।

পড়া (studying) হলো বাইরের কাজ। বই খোলা, ক্লাসে বসা, নোট লেখা, দাগানো। এটা চোখে দেখা যায়, ঘড়িতে মাপা যায়, আর সে কারণেই আমরা এটাকেই পরিশ্রমের প্রমাণ ধরে নিই।

শেখা (learning) হলো মাথার ভেতরের প্রক্রিয়াটা — যেখানে তথ্য সত্যিই গেঁথে যায়, আগের জ্ঞানের সাথে জোড়া লাগে, আর দরকারের সময় নিজে থেকে বেরিয়ে আসে। এটা চোখে দেখা যায় না। তাই আমরা এটাকে হিসাবেই ধরি না।

আর সবচেয়ে বড় কথা — সব পড়া সমান শেখা তৈরি করে না।

ধরুন আপনি ১০ ঘণ্টা পড়লেন, কিন্তু এমন একটা কৌশলে যেটা মাত্র ১০ শতাংশ কার্যকর। তাহলে ওই ১০ ঘণ্টায় আপনার আসল শেখা হলো মাত্র ১ ঘণ্টার সমান।

পাশের বন্ধুটি হয়তো ৪ ঘণ্টা পড়েছে, কিন্তু ৭০ শতাংশ কার্যকর কৌশলে। তার শেখা হলো প্রায় ৩ ঘণ্টার।

আপনি বেশি পরিশ্রম করেছেন। সে বেশি শিখেছে।

এখানেই সেই অন্যায্যতাটা, যেটা এত শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। আপনি খাটছেন ঠিকই — কিন্তু হিসাবটাই ভুল জায়গায় হচ্ছে।

ঘণ্টার হিসাব নয়। প্রতি ঘণ্টায় কতটা শেখা হচ্ছে — আসল প্রশ্নটা এটাই।

তাহলে আজ থেকে কী করবেন? পাঁচটা জিনিস, খুব সহজ —

১. ঘণ্টা গোনা বন্ধ করুন। পড়ার শেষে বই বন্ধ করে খাতায় লিখুন — কী কী মনে আছে। যা লিখতে পারলেন, ওটুকুই আজকের আসল হিসাব। বাকিটা ছিল শুধু বসে থাকা।

২. একঘেয়েমি হলো লাল সংকেত। পড়তে পড়তে যদি ঝিমুনি আসে, মনে হয় চোখ চলছে কিন্তু মাথা চলছে না — বুঝবেন কৌশলটা passive। এখনই বদলান, ঘণ্টা বাড়াবেন না।

৩. অস্বস্তিকে ভয় পাবেন না। পড়তে গিয়ে একটু ধন্দ লাগা, একটু কঠিন লাগা — এটা ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। এটাই মস্তিষ্ক গভীরে কাজ করার লক্ষণ। কার্যকর প্রায় প্রতিটি পদ্ধতিই পরিশ্রমসাপেক্ষ।

৪. প্রতিটি টপিকে একটা প্রশ্ন করুন — "এটা কি বিচ্ছিন্ন একটা তথ্য, নাকি আগে যা শিখেছি তার সাথে জোড়া লাগে?" জোড়া লাগানোর অভ্যাসটাই স্মৃতিকে মজবুত করে।

৫. দিনের শেষে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন — "আজ কত ঘণ্টা পড়লাম?" নয়, বরং "আজ প্রতি ঘণ্টায় কতটা শিখলাম?"

এই একটা প্রশ্ন বদলে দিলে বাকি অনেক কিছু নিজে থেকেই বদলাতে শুরু করে।

আর সবশেষে একটা কথা, যেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। কৌশল যত ভালোই হোক, ইলমের পথে আল্লাহর তাওফিক ছাড়া কিছুই পূর্ণতা পায় না। তাই পড়তে বসার আগে দোয়াটা যেন বাদ না পড়ে — রব্বি যিদনী ইলমা (হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন)।

আগামীকাল দিন ০২ — শেখার পাঁচটি মাত্রা, অর্থাৎ আপনার আসল বাধাটা ঠিক কোথায় সেটা নির্ণয় করার পদ্ধতি। সাথেই থাকুন।

আল্লাহ আমাদের উপকারী ইলম দান করুন। আমিন।

লেখাটি "শেখার শিল্প" বইয়ের একটি অংশ নিয়ে। পুরো কাঠামো, বাকি অধ্যায় এবং ইলম, দোয়া ও রুকইয়াহ পর্বটি বইটিতে রয়েছে — বইটি দেখুন

আরও পড়ুন