← শেখার শিল্প — ৩০ দিন

শেখারশিল্প

“আমার মাথা এমনই” — কথাটা সত্যি নয়

আপনার শেখার ক্ষমতা স্থির নয়। বিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্ককে নতুন করে গড়ে তোলা যায়।

শেখারশিল্পনিউরোপ্লাস্টিসিটিপড়ালেখাশিক্ষার্থীবই
“আমার মাথা এমনই” — কথাটা সত্যি নয়

ক্লাসে একজন থাকে, তাই না?

যে একবার পড়েই বুঝে ফেলে। যে ক্লাসে খুব একটা মনোযোগও দেয় না, তবু পরীক্ষায় ভালো করে। আর আপনি তিনবার পড়েও ধরতে পারেন না।

তারপর একদিন আপনি ভেতরে ভেতরে মেনে নেন — "ওর মাথাটাই আলাদা। আমার মাথা এমনই।"

আমি জানি এই কথাটা কতটা ভারী। কারণ এটা শুধু একটা মতামত নয় — এটা একটা রায়। আর একবার রায়টা মেনে নিলে চেষ্টা করাটাই অর্থহীন মনে হয়।

আজ আমি এই রায়টা চ্যালেঞ্জ করতে চাই।

আপনার শেখার ক্ষমতা স্থির নয়।

মস্তিষ্কের একটা বৈশিষ্ট্য আছে যার নাম neuroplasticity — অর্থাৎ ব্যবহারের সাথে সাথে মস্তিষ্ক নিজের সংযোগ বদলে নেয়, নতুন করে গড়ে ওঠে। যেটা আপনি নিয়মিত করেন, মস্তিষ্ক সেটাতেই ভালো হয়ে ওঠে।

মানে দাঁড়াচ্ছে — আপনি এতদিন যা করেছেন, মস্তিষ্ক ঠিক সেটাতেই দক্ষ হয়েছে। যদি এতদিন বারবার পড়ে মুখস্থ করে থাকেন, তাহলে মস্তিষ্ক "বারবার পড়া"-তে দক্ষ হয়েছে। গভীরে বসানোয় নয়।

এখানে একটা কঠিন কথা বলি।

এতদিন যে পদ্ধতিতে শিখে আপনি আরাম পেয়েছেন, সেটাই সঠিক শেখা নয় — ওটা কেবল টিকে থাকার উপায় ছিল।

তাহলে কোন কৌশলটা সত্যি কাজ করে, চিনব কীভাবে? চারটি নীতি দিয়ে যাচাই করুন —

  • মেমরি একটা উপসর্গ, লক্ষ্য নয়। প্রক্রিয়াটাই আসল; স্মৃতি তার ফল।
  • মানসিক প্রক্রিয়া শারীরিকের চেয়ে বড়। হাত দিয়ে নোট কপি করা নয় — মাথা দিয়ে ভাবা।
  • সংযোগমূলক (higher-order) চিন্তা বিচ্ছিন্ন চিন্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
  • পরিশ্রম ভালো লক্ষণ। সহজ লাগা মানে মস্তিষ্ক কম খাটছে।

এই মানদণ্ডে ফেললে দেখা যায় — বারবার পড়া দুর্বল একটা পদ্ধতি। আর অন্যকে শেখানো, বিশেষ করে একটা দশ বছরের বাচ্চাকে বোঝানোর মতো করে বলা, ভীষণ শক্তিশালী।

এবার আসল অংশ। মস্তিষ্ককে দ্রুত বদলাতে হলে পাঁচটা শর্ত লাগে। এগুলো ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে —

১. Intention (অভিপ্রায়) ঠিক কী বদলাতে চান, স্পষ্ট করে লিখুন। "ভালো ছাত্র হব" নয় — "পড়ার পর বই বন্ধ করে ব্যাখ্যা লিখতে পারব"। অস্পষ্ট ইচ্ছা মস্তিষ্ককে নাড়ায় না।

২. Intensity (তীব্রতা) তীব্রতা রাখুন নিজের নাগালের ঠিক একটু বাইরে — একে বলে zone of proximal development। খুব সহজ হলে মস্তিষ্ক বদলায় না; খুব কঠিন হলে ভেঙে পড়ে। আর কঠিন লাগলেই আরামের গণ্ডিতে ফিরে যাবেন না — ওই কঠিন জায়গাটাই বৃদ্ধির জায়গা।

৩. Variety (বৈচিত্র্য) একই জিনিস বারবার একইভাবে করলে মস্তিষ্ক autopilot-এ চলে যায়। সামান্য ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিন — একে বলে interleaving। আজ MCQ, কাল ব্যাখ্যা, পরশু ডায়াগ্রাম এঁকে।

৪. Frequency (নিয়মিততা) সপ্তাহে একদিন ৮ ঘণ্টার ঝড় নয়। প্রতিদিন অল্প অল্প। স্নায়ু-সংযোগ ঘন ঘন ব্যবহারে মজবুত হয়, একবারের ধাক্কায় নয়।

৫. Duration (দীর্ঘস্থায়িত্ব) ফল আসে ধাপে ধাপে — কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছরে। দুই সপ্তাহে বদল না দেখে হাল ছাড়াটাই সবচেয়ে বড় ভুল।

আর এই পাঁচটার নিচে তিনটে ভিত্তি আছে, যেগুলো অবহেলা করলে উপরেরটা দাঁড়াবে না — আবেগ, ঘুম আর ব্যায়াম। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব দিন ০৬-এ।

শেষ কথাটা মনে রাখুন, এটাই সবচেয়ে জরুরি —

সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে মস্তিষ্ক নয়, লেগে থাকার ক্ষমতা। বয়স বা শুরুর অবস্থান কোনো স্থায়ী বাধা নয়। ধৈর্য ধরে চালিয়ে গেলে এই উন্নতি সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকে।

আর আমাদের জন্য এখানে বাড়তি একটা ভরসা আছে। ইলম আল্লাহর দান — চেষ্টা আমাদের, তাওফিক তাঁর। তাই চেষ্টার সাথে দোয়াটাও চালিয়ে যান।

আগামীকাল দিন ০৫ — চিন্তার ছয়টি স্তর, আর কেন নিচ থেকে উপরে ওঠার চেষ্টাটাই ভুল।

যে বন্ধুটা "আমার মাথা এমনই" বলে হাল ছেড়ে দিয়েছে — তাকে এই পোস্টটা পাঠিয়ে দিন।

আল্লাহ আমাদের উপকারী ইলম দান করুন। আমিন।

লেখাটি "শেখার শিল্প" বইয়ের একটি অংশ নিয়ে। পুরো কাঠামো, বাকি অধ্যায় এবং ইলম, দোয়া ও রুকইয়াহ পর্বটি বইটিতে রয়েছে — বইটি দেখুন

পড়াশোনা ও শিক্ষার্থী — এই বিষয়ে আরও

গাইড ও প্রোটোকল

PDF গাইড

ব্লগ

পড়াশোনা ও শিক্ষার্থী — সব গাইড, অডিও, PDF ও লেখা →

আরও পড়ুন