← শেখার শিল্প — ৩০ দিন

ইচ্ছাশক্তির ওপর দাঁড়ানো পরিকল্পনা টেকে না

শেখারশিল্পসিস্টেমঅভ্যাসপ্রোডাক্টিভিটিশিক্ষার্থী
ইচ্ছাশক্তির ওপর দাঁড়ানো পরিকল্পনা টেকে না

প্রতি সেমিস্টারের শুরুতে একই দৃশ্য।

নতুন খাতা। নতুন রুটিন। "এবার প্রতিদিন ভোর ৫টায় উঠব, ৬ ঘণ্টা পড়ব, রাত ১১টায় ঘুমাব।"

তিন দিন চলে। চতুর্থ দিন একটু ক্লান্ত লাগে। পঞ্চম দিন বাদ যায়। ষষ্ঠ দিন থেকে রুটিনটা আর নেই।

তারপর অপরাধবোধ। তারপর আবার নতুন রুটিন।

কেন প্রতিবার এমন হয়?

কারণ পরিকল্পনাটা দাঁড়িয়ে ছিল ইচ্ছাশক্তির ওপর। আর ইচ্ছাশক্তি একটা সীমিত সম্পদ — ক্লান্ত হলে ফুরিয়ে যায়, চাপ বাড়লে ভেঙে পড়ে।

আজকের মূল কথাটা তাই:

willpower আর motivation-এর ওপর নির্ভরতা কমান।

এর বদলে এমন process তৈরি করুন যা নিজে থেকেই আপনাকে ফলাফলের দিকে টানে। আর সেই process-গুলো জুড়ে দিয়ে গড়ে তুলুন আপনার সিস্টেম

উদাহরণ দিই। "প্রতিদিন পড়ব" — এটা ইচ্ছা।

কিন্তু: রাতে ঘুমানোর আগে বইটা খুলে টেবিলে রেখে দেওয়া, ফোনটা অন্য ঘরে চার্জে দেওয়া, সকালে উঠে ওযু করে সরাসরি ওই টেবিলে বসা — এটা process. এখানে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না, তাই ইচ্ছাশক্তিও খরচ হয় না।

সিস্টেম কেমন হওয়া উচিত — পাঁচটি নীতি

১. সামগ্রিকভাবে ভাবুন

ধরেই নিন পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। এটা হতাশাবাদ নয়, এটা প্রকৌশল।

অতীতের ব্যর্থ চেষ্টাগুলো ঘেঁটে দেখুন — ঠিক কোথায় ভেঙেছিল? সম্ভাব্য সব বাধার একটা তালিকা বানান। তারপর সিস্টেমটা সেই বাধাগুলোর হিসাব রেখেই গড়ুন।

"অসুস্থ হলে কী হবে? অতিথি এলে কী হবে? মন খারাপ থাকলে কী হবে?" — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগেই ঠিক করা থাকলে সিস্টেম ভাঙে না।

২. পুনরাবৃত্তিযোগ্যতার জন্য গড়ুন

এটা সবচেয়ে জরুরি নীতি।

সিস্টেমকে চলতে হবে আপনার সবচেয়ে খারাপ দিনেও।

আমরা সিস্টেম বানাই সেরা দিনের জন্য — যেদিন উৎসাহ তুঙ্গে, শরীর ঝরঝরে। কিন্তু সিস্টেমের পরীক্ষা হয় খারাপ দিনে।

তাই প্রশ্নটা করুন: "যেদিন সবচেয়ে খারাপ লাগবে, সেদিনও কি এটা করতে পারব?" যদি উত্তর না হয়, সিস্টেমটা ছোট করুন।

দিনে ৬ ঘণ্টার রুটিন যেটা ৫ দিন চলে, তার চেয়ে দিনে ৯০ মিনিটের রুটিন যেটা ৫ মাস চলে — অনেক বেশি ফলদায়ক।

৩. ঘর্ষণ কমান

ঘর্ষণ ও বাধা যতটা সম্ভব কমান, যেন কাজটা করতে জোর করে ইচ্ছাশক্তি ঢালতে না হয়

বই খুঁজতে ৫ মিনিট? সেটা ঘর্ষণ। টেবিল গোছাতে ১০ মিনিট? সেটা ঘর্ষণ। প্রতিটা ঘর্ষণ আপনার শুরু করার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

৪. সমস্যাকে দেখুন সমাধানযোগ্য ধাঁধা হিসেবে

কম-পরিশ্রমের সমাধান আর সম্ভাব্য বাধার মাঝে বারবার দোল খেয়ে সঠিক সমন্বয়ে পৌঁছান।

একবারে নিখুঁত সিস্টেম কেউ বানাতে পারে না। এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার। এক সপ্তাহ চালান, দেখুন কোথায় ভাঙে, ঠিক করুন, আবার চালান।

আর একটা কথা — অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে লেগে থাকুন। বেশিরভাগ মানুষ তৃতীয় ব্যর্থতার পর ছেড়ে দেয়। চতুর্থবার চেষ্টা করাটাই প্রায়ই যথেষ্ট।

৫. অস্বস্তিকে স্বাগত জানান

এই কথাটা মনে রাখার মতো:

পরিবর্তন না করার অস্বস্তি প্রায়ই পরিবর্তন করার অস্বস্তির চেয়ে অনেক বড়।

নতুন অভ্যাস গড়তে দুই সপ্তাহ কষ্ট হবে। কিন্তু পুরনো অভ্যাসে থেকে যাওয়ার কষ্টটা চলবে বছরের পর বছর — শুধু সেটা ছড়িয়ে থাকে বলে আমরা টের পাই না।

আর শেষ নীতি — Band-aid খুলে ফেলুন

কখনো কখনো সাময়িক জোড়াতালি লাগে। মনোযোগ ধরে রাখতে অ্যাপ ব্লকার, ঘুম কম হলে কফি, চাপ সামলাতে যা যা।

সেগুলো দিয়ে আপাতত চালান — কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু ভুলে যাবেন না: মূল সমস্যা সমাধানের জন্য অভ্যাস বদলানোকেই নতুন লক্ষ্য বানিয়ে সিস্টেমে যুক্ত করুন।

নাহলে যেটা হয় — জোড়াতালিটাই স্থায়ী হয়ে যায়। আর তিন মাস পর দেখা যায় আপনি পাঁচটা ব্যান্ড-এইড নিয়ে চলছেন, অথচ ক্ষতটা যেমন ছিল তেমনই আছে।

আগামীকাল দিন ২১ — Reverse Goal Setting: উল্টো দিক থেকে লক্ষ্য নির্ধারণের পাঁচ ধাপ।

আজ একটা কাজ করুন — আপনার বর্তমান রুটিনটা দেখে জিজ্ঞেস করুন, "সবচেয়ে খারাপ দিনেও কি এটা চলবে?" না হলে ছোট করুন।

আল্লাহ আমাদের কাজে বরকত দিন। আমিন।

লেখাটি "শেখার শিল্প" বইয়ের একটি অংশ নিয়ে। পুরো কাঠামো, বাকি অধ্যায় এবং ইলম, দোয়া ও রুকইয়াহ পর্বটি বইটিতে রয়েছে — বইটি দেখুন

আরও পড়ুন