সদকা
সদকা কি রুকইয়াহ বা ডাক্তারের বিকল্প?
গুরুতর অসুস্থ কারো পরিবারের একজন মানুষ যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন সবচেয়ে আগে যে কথাটা তার শোনা দরকার, সেটা দিয়েই শুরু করা যাক — স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ভাষায়
এই লেখায় যা আছে
- কেন এই সতর্কতা এত জরুরি
- ফতোয়া-সাইটগুলোর সর্বসম্মত অবস্থান: সদকা "কারণসমূহের মধ্যে একটি কারণ"
- এটা নতুন কোনো "আধুনিক আপস" নয় — ক্লাসিক্যাল আলিমরাও একই কথা বলেছেন
- একটি জরুরি সূক্ষ্মতা: "চিকিৎসা করা কি ফরজ?" — এই প্রশ্নে আলিমদের মতভেদ আছে
- একটি বাস্তব উদাহরণ: ভালো নিয়তেও ভুল নিয়ম বানানো যায় না
- তাহলে করণীয় কী — একজন অসুস্থ স্বজনের পাশে থেকে
- তথ্যসূত্র
- আলিমদের ব্যাখ্যা
- অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস
গুরুতর অসুস্থ কারো পরিবারের একজন মানুষ যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন সবচেয়ে আগে যে কথাটা তার শোনা দরকার, সেটা দিয়েই শুরু করা যাক — স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
সদকা, দোয়া আর রুকইয়াহ রোগীর জন্য বরকতময় এবং ইসলামে উৎসাহিত। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই ডাক্তারের চিকিৎসার বদলে নয় — এগুলো ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি। একজন ক্যান্সার রোগীর কেমোথেরাপি বন্ধ করার কারণ সদকা হতে পারে না। একজন অস্ত্রোপচার-প্রয়োজন রোগীর সার্জারি পিছিয়ে দেওয়ার কারণ রুকইয়াহ হতে পারে না। ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ বাদ দিয়ে শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়। এই সিরিজের এই লেখাটি শুধু এই একটি বার্তা নিশ্চিত করার জন্যই লেখা — বাকি সবকিছু এর ব্যাখ্যা মাত্র।
কেন এই সতর্কতা এত জরুরি
সদকার মাধ্যমে রোগমুক্তির অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে — ইন্টারনেটে, বইয়ে, মুখে মুখে। এসব গল্প মানুষকে আশা দেয়, এবং আশা রাখা দোষের কিছু না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু মানুষ এই ধরনের গল্প শুনে ভুল বার্তা নিয়ে নেয় — "আমি শুধু সদকা দিলেই তো হবে, ডাক্তারের কী দরকার?" এই ভুল ধারণা থেকে যদি কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেয় বা বাদ দেয়, তাহলে সেটা শুধু ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধে নয় — জীবনের জন্যও বিপজ্জনক। তাই এই লেখায় আমরা দেখব, আরবি ফতোয়া-সাইট, ক্লাসিক্যাল আলিম এবং ইংরেজি ফতোয়া উৎসগুলো আসলে এই প্রশ্নে কী বলে।
ফতোয়া-সাইটগুলোর সর্বসম্মত অবস্থান: সদকা "কারণসমূহের মধ্যে একটি কারণ"
আরবি ফতোয়া-সাইটগুলো নিয়ে করা গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে — কোনো একটি ফতোয়া-সাইটও এমন দাবি করেনি যে সদকা ডাক্তার বা রুকইয়াহর জায়গা নিতে পারে। বরং তারা বারবার একই ভাষায় এই কথাটা বলেছে: সদকা হলো "سبب من الأسباب" — শিফা লাভের অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ, একমাত্র বা চূড়ান্ত কারণ নয়।
ইসলামওয়েব (islamweb.net)-এর একটি ফতোয়া (নং ৩২২৭৭৭) সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে — রুকইয়াহ এবং ডাক্তারি চিকিৎসা একসাথে করা নিয়ে। ফতোয়ার ভাষা:
"لا حرج في الجمع بين الرقية والتداوي عند الأطباء"<br>("রুকইয়াহ এবং ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নেওয়া — এই দুটো একসাথে করায় কোনো দোষ নেই।")
একই বিষয়ে ইসলামওয়েবের আরেকটি ফতোয়া (নং ৩৪৭৫৫১, "الاستشفاء بالرقية مع العلاج الطبي" — ডাক্তারি চিকিৎসার সাথে রুকইয়াহর মাধ্যমে শিফা কামনা) এবং আরেকটি নিবন্ধ ("الرقية مع العلاج الطبي: كيف يجمع المسلم بينهما؟" — একজন মুসলিম কীভাবে দুটো একসাথে করবে) একই মূলনীতির ওপর জোর দেয়: সঠিক পথ হলো ডাক্তারের কাছ থেকে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নেওয়া, এবং একই সাথে রুকইয়াহ ও দোয়ার মাধ্যমে বরকত ও পূর্ণ শিফা কামনা করা — একটাকে আরেকটার বিকল্প বানানো নয়।
এই একই ফতোয়াগুলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে — রুকইয়াহ তখনই সমস্যাযুক্ত হয়ে ওঠে, যখন কেউ এটার কারণে ডাক্তারি চিকিৎসা ছেড়ে দেয়, অথবা মনে করে যে ওষুধ ব্যবহার করা প্রকৃত তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) পরিপন্থী। বাস্তবে ব্যাপারটা উল্টো — ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং একই সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, দুটো একসাথেই তাওয়াক্কুলের অংশ।
সদকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্নেও একই সুর পাওয়া যায়। ইসলামওয়েবের একাধিক ফতোয়া (নং ১২৬৬৪৬, ১৪০০৬৬, ১৫৩২০৭) নিশ্চিত করে যে রোগমুক্তির নিয়তে সদকা দেওয়া বৈধ ও উৎসাহযোগ্য — কিন্তু কোথাও বলা হয়নি এটা চিকিৎসার বদলি। ইসলামকিউএ (islamqa.info, উত্তর নং ৫৩৯৯৯৫)-ও একই অবস্থান — সদকাকে বলা হয়েছে "سبب من أسباب الشفاء" (শিফার কারণসমূহের একটি কারণ), চূড়ান্ত সমাধান নয়।
সংক্ষেপে: গবেষণায় পাওয়া কোনো ফতোয়া-উৎসেই এমন কিছু নেই যা বলে সদকা দিয়ে ডাক্তার বা রুকইয়াহর জায়গা পূরণ করা যায়। এই বিষয়ে ফতোয়া জগতের অবস্থান একমুখী।
এটা নতুন কোনো "আধুনিক আপস" নয় — ক্লাসিক্যাল আলিমরাও একই কথা বলেছেন
কেউ কেউ ভাবতে পারেন, "ডাক্তার-বিজ্ঞানের যুগে এসে হয়তো আলিমরা এই ভারসাম্যের কথা বলছেন — নইলে আগে হয়তো শুধু আধ্যাত্মিক চিকিৎসার ওপরই জোর দেওয়া হতো।" গবেষণায় পাওয়া তথ্য এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে।
মাসজিদ দারুসসালাম (Masjid DarusSalam)-এর ইংরেজি ব্যাখ্যাগ্রন্থে আল-জামি' আস-সাগীর-এর হাদীস নং ৫৬৬৯ ("দাও্উ মারদাকুম বিসসদকা" — "তোমাদের রোগীদের সদকা দিয়ে চিকিৎসা করো") নিয়ে আলোচনায় নবীজীর চিকিৎসা-পদ্ধতির তিনটি ধারার কথা বলা হয়েছে: (১) প্রচলিত/দৈহিক চিকিৎসা, (২) আধ্যাত্মিক চিকিৎসা, এবং (৩) দুটোর সমন্বয়। এই আলোচনাতেই উদ্ধৃত করা হয়েছে ক্লাসিক্যাল আলিম ইমাম আল-হালিমী (al-Halimi)-কে, যিনি স্পষ্ট করে বলেছেন — সদকা ওষুধের বিকল্প নয়। তাঁর কথার অনুবাদ:
"হতে পারে আল্লাহ তা'আলা এমন ফয়সালা করে রেখেছেন যে, কেউ চিকিৎসা নিলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। আর যদি সে চিকিৎসা না নেয়, তাহলে রোগ তাকে গ্রাস করবে এবং সে মারা যাবে।"
এই একটি বাক্যই এই লেখার পুরো বার্তাকে সংক্ষেপ করে দেয়, এবং সেটা কোনো আধুনিক ফতোয়া কমিটির কথা নয় — এটা একজন ক্লাসিক্যাল আলিমের কথা, বহু শতাব্দী আগের। অর্থাৎ "সদকা-দোয়া-রুকইয়াহর পাশাপাশি ডাক্তারি চিকিৎসাও নিতে হবে" — এই বোঝাপড়াটা কোনো নতুন যুগের বিজ্ঞান-সমঝোতা নয়, বরং ইসলামি চিকিৎসা-দর্শনের একটি পুরনো, প্রতিষ্ঠিত অংশ।
একটি জরুরি সূক্ষ্মতা: "চিকিৎসা করা কি ফরজ?" — এই প্রশ্নে আলিমদের মতভেদ আছে
এখানে সততার সাথে একটা কথা স্বীকার করা দরকার, যাতে এই লেখা কোনো মিথ্যা ঐকমত্যের দাবি না করে। প্রশ্ন হলো — ডাক্তারি চিকিৎসা নেওয়া কি ইসলামে সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক (ফরজ)?
গবেষণায় পাওয়া গেছে, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ-র ঐতিহ্য থেকে জানা যায় — অধিকাংশ আলিমের মতে চিকিৎসা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, এবং আলিমদের মধ্যে প্রকৃত মতভেদ ছিল এই বিষয়ে যে — তাওয়াক্কুলের কারণে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া বেশি ফজিলতপূর্ণ কিনা। এটা একটা সত্যিকারের, এখনো অমীমাংসিত ক্লাসিক্যাল বিতর্ক — কোনো একরকম সরলীকৃত "সবসময় চিকিৎসা করতেই হবে, এটাই একমাত্র মত" — এমন দাবি ইতিহাসে ছিল না।
তবে এখানে ভুল বোঝাবুঝির জায়গা এড়ানো জরুরি। এই মতভেদের অর্থ এই নয় যে চিকিৎসা করা অনুৎসাহিত বা ঐচ্ছিক বিষয়। বরং অধিকাংশ আধুনিক ফতোয়া-সংস্থা (যেমন মাজমা' আল-ফিকহ আল-ইসলামী)-এর অবস্থান হলো — নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, যেমন: চিকিৎসা না নিলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলে, কোনো অঙ্গ বা কার্যক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকলে, শরীর মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকলে, অথবা অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে। ইংরেজি ফতোয়া-সাইটগুলোতেও (ইসলামওয়েব, ইসলামকিউএ) একই ধারাবাহিক অবস্থান পাওয়া যায় — চিকিৎসা নেওয়া উৎসাহিত এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক, আর দোয়া-সদকা কখনোই তার বিকল্প নয়।
তাই এই লেখার সঠিক ও সৎ ভাষা হলো: "আধ্যাত্মিক আমলকে ডাক্তারি চিকিৎসার সাথে একত্র করো" — এই কথাই সবচেয়ে নিরাপদ এবং প্রমাণ-সমর্থিত অবস্থান। "চিকিৎসা করা সবসময়, সব ক্ষেত্রে সর্বসম্মতভাবে ফরজ" — এই ধরনের অতি-সরলীকৃত দাবি না করাই সততার দাবি। কিন্তু এই সূক্ষ্মতা কখনোই এই বার্তাকে দুর্বল করে না যে গুরুতর অসুস্থতায় — যেখানে চিকিৎসা না নিলে জীবনের ঝুঁকি থাকে — চিকিৎসা নেওয়াই সঠিক পথ, এবং তার পাশে সদকা-দোয়া-রুকইয়াহ যোগ করা আরও উত্তম।
একটি বাস্তব উদাহরণ: ভালো নিয়তেও ভুল নিয়ম বানানো যায় না
গবেষণায় একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া গেছে, যা দেখায় কীভাবে ভালো উদ্দেশ্য থেকেও একটি ভিত্তিহীন নতুন নিয়ম তৈরি হয়ে যেতে পারে। ইসলামকিউএ (islamqa.info, উত্তর নং ৩০১৬০০)-তে একটি প্রশ্ন এসেছিল — জাদু/সিহর থেকে বাঁচার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ে (যেমন ফজরের ঠিক আগের সময়, "وقت السحر") সদকা দেওয়ার একটি প্রচলিত চর্চা নিয়ে। এখানে আরবি শব্দ "সাহার" (سحر)-এর দুটো অর্থ নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে — একটি অর্থ "ভোররাত/শেষ রাত" (যে সময়ে ইস্তিগফার করার কথা কুরআনে এসেছে), আর আরেকটি অর্থ "জাদু/সিহর"। কেউ কেউ এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলে ভেবে নিয়েছেন — জাদু থেকে বাঁচতে হলে ঠিক সেই "সাহার" সময়েই সদকা দিতে হবে।
ইসলামকিউএ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে — এই চর্চাটি একটি বিদ'আত (ভিত্তিহীন নতুন সংযোজন)। কুরআনে ভোররাতের যে ফজিলতের কথা এসেছে, সেটা ইস্তিগফার সম্পর্কে, সদকা সম্পর্কে নয়। এই সময়টাকে সদকার সাথে জুড়ে দিয়ে একটা "নিয়ম" বানিয়ে ফেলা — এমনকি নিয়তটা ভালো হলেও — শরিয়তে ভিত্তিহীন।
এই উদাহরণ থেকে আমাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সদকা, দোয়া, রুকইয়াহ — এসবই বরকতময় আমল, কিন্তু আমরা যেন নিজে থেকে এসবের সাথে অতিরিক্ত শর্ত, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নির্দিষ্ট পদ্ধতি জুড়ে না দিই, যার কোনো দলিল নেই। "এই নির্দিষ্ট অংকের সদকা দিলেই রোগ সারবে" বা "এই নির্দিষ্ট সময়ে সদকা দিলেই জাদু কেটে যাবে" — এই ধরনের যান্ত্রিক নিশ্চয়তার দাবি সমর্থনকারী কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। শিফা আল্লাহর হাতে, কোনো যান্ত্রিক সমীকরণে নয়।
তাহলে করণীয় কী — একজন অসুস্থ স্বজনের পাশে থেকে
যদি আপনার কোনো প্রিয়জন অসুস্থ থাকেন — বিশেষ করে গুরুতর কোনো অসুখে — তাহলে এই লেখার শেষ কথাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিচের প্রতিটি ধাপই একসাথে করার কথা, একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা নয়:
- প্রথমে ডাক্তারের কাছে যান। রোগ নির্ণয় করান, ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- ডাক্তারের দেওয়া চিকিৎসা-পরিকল্পনা মেনে চলুন — ওষুধ, কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার, ফলোআপ — যা কিছু নির্ধারিত হয়েছে, তা চালিয়ে যান। কোনো অবস্থাতেই "সদকা দিচ্ছি তো, তাই ওষুধ বন্ধ করে দিই" — এই সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- এর পাশাপাশি সদকা দিন — রোগীর জন্য নিয়ত করে, সামর্থ্য অনুযায়ী।
- দোয়া করুন — নিজে করুন, রোগীকে করতে উৎসাহ দিন, পরিবারের অন্যদেরও দোয়ায় শামিল করুন।
- রুকইয়াহ করুন বা করান — কুরআন থেকে প্রমাণিত আয়াত ও দোয়া দিয়ে, শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে।
এই পাঁচটি ধাপ একসাথে মিলেই প্রকৃত ইসলামি চিকিৎসা-দর্শন। সদকা, দোয়া আর রুকইয়াহ রোগীর মনে সাহস জোগায়, পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়, আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের দুয়ার খুলে দেয় — কিন্তু এগুলো ডাক্তারের জায়গা নেয় না, নিতে পারে না, এবং কোনো নির্ভরযোগ্য আলিম বা ফতোয়া কখনো এমন দাবি করেননি। যে বিশ্বাস থেকে কেউ চিকিৎসা এড়িয়ে যায় এই ভেবে যে "সদকাই যথেষ্ট" — সেটা তাওয়াক্কুল নয়, বরং একটা বিপজ্জনক ভুল বোঝাবুঝি, যা রোগীর জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
আল্লাহ তা'আলা কারণ (আসবাব) সৃষ্টি করেছেন এবং সেই কারণ অবলম্বন করার নির্দেশও দিয়েছেন। ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়া, চিকিৎসা করানো — এসবও একধরনের আসবাব, ঠিক যেমন সদকা-দোয়া-রুকইয়াহও আসবাব। শিফা আসে আল্লাহর কাছ থেকে, কিন্তু তিনি আমাদের কারণসমূহ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সেই শিফা পাঠান — একটি কারণ বাদ দিয়ে অন্যটি ধরে রাখার মধ্য দিয়ে নয়।
তথ্যসূত্র
আলিমদের ব্যাখ্যা
- ইমাম আল-হালিমী (উদ্ধৃত: Masjid DarusSalam, "Commentary and Reflections on Ḥadith #5669 from al-Jamiʿ al-Ṣaghir: 'Treat Your Sick with Charity'") — "হতে পারে আল্লাহ তা'আলা এমন ফয়সালা করে রেখেছেন যে, কেউ চিকিৎসা নিলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। আর যদি সে চিকিৎসা না নেয়, তাহলে রোগ তাকে গ্রাস করবে এবং সে মারা যাবে।"
- ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ-র ঐতিহ্য (Ibn Taymiyyah's tradition, secondary-source citation) — অধিকাংশ আলিমের মতে চিকিৎসা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়; তাওয়াক্কুলের কারণে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া বেশি ফজিলতপূর্ণ কিনা তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে প্রকৃত মতভেদ ছিল। (নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা-উদ্ধৃতি যাচাই-অসম্পূর্ণ — এই বিস্তারিত অবস্থান প্রাথমিক উৎস সরাসরি না পড়ে দ্বিতীয় উৎস থেকে নেওয়া।)
অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস
- ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ৩২২৭৭৭ — "لا حرج في الجمع بين الرقية والتداوي عند الأطباء" (রুকইয়াহ ও ডাক্তারি চিকিৎসা একসাথে করায় কোনো দোষ নেই)
- ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ৩৪৭৫৫১ — "الاستشفاء بالرقية مع العلاج الطبي" (ডাক্তারি চিকিৎসার সাথে রুকইয়াহর মাধ্যমে শিফা কামনা)
- ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ১২৬৬৪৬, ১৪০০৬৬, ১৫৩২০৭ — রোগমুক্তির নিয়তে সদকা দেওয়ার বৈধতা সম্পর্কিত ফতোয়া
- ইসলামকিউএ (islamqa.info) উত্তর নং ৫৩৯৯৯৫ — সদকাকে "শিফার কারণসমূহের একটি কারণ (سبب من أسباب الشفاء)" হিসেবে ব্যাখ্যা
- ইসলামকিউএ (islamqa.info) উত্তর নং ৩০১৬০০ — "تخصيص الصدقة بوقت السحر بدعة" (জাদু থেকে বাঁচতে নির্দিষ্ট সময়ে সদকা দেওয়া বিদ'আত)
- ইসলামকিউএ ইংরেজি সংস্করণ — "Do Muslims Have to Seek Medical Treatment?" — স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (Lajnah Da'imah)-এর অবস্থান উদ্ধৃত করে
- মাজমা' আল-ফিকহ আল-ইসলামী (Majma' al-Fiqh al-Islami)-এর নীতিগত অবস্থান (দ্বিতীয় উৎস থেকে উদ্ধৃত) — নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (মৃত্যু-ঝুঁকি, অঙ্গহানির আশঙ্কা, সংক্রমণের ঝুঁকি) চিকিৎসা নেওয়া বাধ্যতামূলক
উল্লেখ্য: উপরের কিছু ফতোয়া ও উদ্ধৃতি এই সিরিজের গবেষণা-পর্বে সংগৃহীত সেকেন্ডারি সারাংশ থেকে নেওয়া, প্রতিটির মূল আরবি/ইংরেজি পৃষ্ঠা সরাসরি পুনরায় পড়ে যাচাই করা হয়নি। ফতোয়া নম্বর ও সাইটের নাম গবেষণা নথিতে যেভাবে ছিল, সেভাবেই এখানে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
এই লেখাটি বহু-ভাষার ফতোয়া ও ইসলামি চিকিৎসা-নীতিশাস্ত্র সংক্রান্ত স্বাধীন গবেষণার ভিত্তিতে প্রস্তুত।
আরও পড়ুন
সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা: একটি ভূমিকা ও পাঁচটি ভিন্ন দাবি
আপনি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময় শুনেছেন বা পড়েছেন — "সদকা দিয়ে রোগ ভালো হয়", "কিছু মানুষ ক্যান্সার থেকে সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছেন", "সদকা করো, আল্লাহ রোগ
«দাউউ মারদাকুম বিসসদকা» হাদীসটি কতটা সহীহ? — একটি সৎ যাচাই
«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি) বইটির একেবারে কেন্দ্রে আছে একটি হাদীস: «داووا مرضاكم بالصدقة» — "তোমাদের অসুস্থদের সদক
ইবনুল কাইয়িম কি সত্যিই শুধু সদকার কথা বলেছিলেন?
«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকা দিয়ে চিকিৎসার বিস্ময়কর নিদর্শন) বইটিতে ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর দুটি খুবই পরিচিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে — একট