← সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা

সদকা

ইবনুল কাইয়িম কি সত্যিই শুধু সদকার কথা বলেছিলেন?

«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকা দিয়ে চিকিৎসার বিস্ময়কর নিদর্শন) বইটিতে ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর দুটি খুবই পরিচিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে — একট

সদকারুকইয়াহহাদীস যাচাই
এই লেখায় যা আছে
  1. ভূমিকা
  2. প্রথম উদ্ধৃতি: আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব (পৃ. ৪৯-৫০)
  3. "বালা" মানে কী — শুধু কি রোগ?
  4. হাদীসের প্রসঙ্গ: "ميتة السوء" (মন্দ মৃত্যু)
  5. তাহলে কি এই উদ্ধৃতি সদকা-চিকিৎসার প্রমাণ না?
  6. দ্বিতীয় উদ্ধৃতি: যাদুল মাআদ (৪/১০-১১)
  7. তালিকাটি লক্ষ্য করুন — সদকা একা নয়
  8. ইবনুল কাইয়িম আসলে কী দাবি করছেন
  9. এটা কি বইয়ের ভুল, নাকি প্রতারণা?
  10. এই প্রেক্ষাপট জানার পর কী লাভ?
  11. ব্যবহারিক পরামর্শ
  12. উপসংহার
  13. তথ্যসূত্র
  14. আলিমদের ব্যাখ্যা
  15. অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস

ভূমিকা

«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকা দিয়ে চিকিৎসার বিস্ময়কর নিদর্শন) বইটিতে ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর দুটি খুবই পরিচিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে — একটি তাঁর «আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব» গ্রন্থ থেকে, অন্যটি «যাদুল মাআদ» থেকে। এই দুটি উক্তি ইসলামী বই, লেকচার ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বহুবার ঘুরেফিরে আসে, এবং প্রতিবারই প্রায় একইভাবে — সদকা যে অসুখ সারাতে পারে তার প্রমাণ হিসেবে।

উক্তি দুটো একদম সত্যি — শব্দ বাই শব্দ ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহরই কথা। বইটি এখানে কোনো মিথ্যা বলেনি বা কথা বানায়নি। কিন্তু একটি উদ্ধৃতির শব্দগুলো নির্ভুল হলেও, সেটাকে যে প্রসঙ্গ থেকে টেনে আনা হয়েছে সেই প্রসঙ্গটা যদি বাদ পড়ে যায়, তাহলে পাঠকের মনে একটা দাবি তৈরি হয়ে যেতে পারে যা মূল লেখক আসলে করেননি। এই লেখায় আমরা দুটি উদ্ধৃতির চারপাশে কী ছিল তা দেখব — যাতে ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর শিক্ষাটা আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায়, ছোট করে নয়।

প্রথম উদ্ধৃতি: আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব (পৃ. ৪৯-৫০)

বইয়ে উদ্ধৃত মূল আরবি বাক্যটি এরকম:

«فإنَّ للصَّدَقة تأثيراً عجيباً في دفع أنواع البلاء، ولو كانت مِن فاجر أو مِن ظالِم، بل من كافر! فإنَّ الله تعالى يدفع بها عنه أنواعاً من البلاء؛ وهذا أمرٌ معلوم عنْدَ الناس خاصتهم وعامتهم، وأهل الأرض كلهم مُقرُّون بـه لأنهم جرَّبوه»

অর্থ: «নিশ্চয়ই নানা রকম বালা-বিপদ দূর করার ব্যাপারে সদকার এক বিস্ময়কর প্রভাব রয়েছে — এমনকি সদকা যদি কোনো পাপাচারী বা যালিমের পক্ষ থেকেও হয়, বরং কোনো কাফিরের পক্ষ থেকেও হয়! কারণ আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা তার থেকে নানা রকম বালা দূর করে দেন। এ বিষয়টি মানুষের কাছে সুবিদিত — বিশেষ ও সাধারণ সবার কাছেই; পৃথিবীর সব মানুষই এ কথা স্বীকার করে, কারণ তারা এটি পরখ করে দেখেছে।»

স্বাধীন যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই বাক্যটি একাধিক উৎসে হুবহু এই শব্দ-বিন্যাসে পাওয়া যায় এবং «আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব ص:৫০-৪৯» (পৃ. ৪৯-৫০) হিসেবেই উদ্ধৃত হয় — অর্থাৎ বইয়ের পাতা-নম্বরও মিলে যাচ্ছে। এতটুকু নিশ্চিত।

"বালা" মানে কী — শুধু কি রোগ?

এখানে যে শব্দটা মূল ভূমিকা পালন করছে তা হলো البلاء (আল-বালা) — অর্থ বিপদ, আপদ, পরীক্ষা, কষ্ট। এটি একটি বিস্তৃত (broad) আরবি শব্দ, যার আওতায় পড়ে দারিদ্র্য, দুর্ঘটনা, শত্রুতা, মৃত্যু, রোগ — সবকিছুই। ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ এখানে বলছেন সদকা "أنواعاً من البلاء" — অর্থাৎ "নানা রকম বিপদ" — দূর করে। তিনি নির্দিষ্টভাবে শারীরিক অসুখের কথা এই বাক্যে বলেননি; বরং একটি ব্যাপক, সাধারণ দাবি করছেন।

হাদীসের প্রসঙ্গ: "ميتة السوء" (মন্দ মৃত্যু)

মূল গ্রন্থে এই বাক্যের ঠিক পরেই ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ তিরমিযীতে বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস উল্লেখ করেন, যেখানে নবী ﷺ বলেছেন:

«إن الصدقة تطفئ غضب الرب، وتدفع ميتة السوء» — «নিশ্চয়ই সদকা রবের ক্রোধ নিভিয়ে দেয়, এবং মন্দ মৃত্যু প্রতিরোধ করে।»

লক্ষ্য করুন — এখানে যে নির্দিষ্ট উদাহরণটা দেওয়া হয়েছে তা হলো "ميتة السوء" (মন্দ/খারাপ মৃত্যু), রোগমুক্তি নয়। এটাই দেখায়, এই পুরো অনুচ্ছেদের মূল বিষয়বস্তু হলো সদকার মাধ্যমে সাধারণভাবে বিপদ প্রতিরোধ (এর মধ্যে হয়তো অসুখও পড়তে পারে, কিন্তু পাঠ্যাংশ নিজে সেটা স্পষ্টভাবে বলছে না) — নির্দিষ্টভাবে শারীরিক রোগ-নিরাময় নয়।

তাহলে কি এই উদ্ধৃতি সদকা-চিকিৎসার প্রমাণ না?

এটাকে সরাসরি "না" বলাটাও ঠিক হবে না। "বালা" এর মধ্যে অসুখ-বিসুখও নিশ্চয়ই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে — এটা একটা যুক্তিসঙ্গত সম্প্রসারণ (extension)। কিন্তু এই নির্দিষ্ট বাক্যাংশটি নিজে থেকে "সদকা রোগ সারায়" এই সংকীর্ণ দাবিটা করছে না — এটি করছে একটি ব্যাপক দাবি যার একটি সম্ভাব্য অংশ হলো রোগমুক্তি। পার্থক্যটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ: একটি সাধারণ নীতিকে নির্দিষ্ট প্রয়োগে সীমাবদ্ধ করে দেখানো এক ধরনের সরলীকরণ, যা মূল বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করে না, তবে তার পরিধি সংকুচিত করে ফেলে।

(একটি ছোট স্বচ্ছতার নোট: এই উদ্ধৃতির ঠিক কোন প্রকাশনা-সংস্করণে পৃ. ৪৯-৫০ নম্বর মিলে যায়, তা এই যাচাই-প্রক্রিয়ায় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি — কারণ ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনায় পৃষ্ঠাসংখ্যা ভিন্ন হয় (যেমন দারুল হাদীস সংস্করণে এটি পৃ. ৩১-এ পাওয়া যায়)। তবে বাক্যটির মূল বক্তব্য ও শব্দবিন্যাস একাধিক স্বতন্ত্র উৎসে হুবহু মিলে নিশ্চিত হয়েছে।)

দ্বিতীয় উদ্ধৃতি: যাদুল মাআদ (৪/১০-১১)

বইয়ে উদ্ধৃত দ্বিতীয় বাক্যটি আরও দীর্ঘ:

«ها هنا من الأدوية التي تشفي من الأمراض ما لم يهتدِ إليها عقولُ أكابر الأطباء، ولم تصِلْ إليها علومُهُم وتجاربهم وأقيستهم من الأدوية القلبية والروحانية وقوة القلب واعتماده على الله والتوكل عليه، والالتجاء إليه، والانطراح والانكسار بين يديه، والتذلُّل له، والصدقة، والدعاء، والتوبة والاستغفار، والإحسان إلى الخلق وإغاثة الملهوف والتفريج عن المكروب؛ فإن هذه الأدوية قد جربتها الأمم على اختلاف أديانها ومللها فوجدوا لها من التأثير في الشفاء ما لا يصل إليه علم أعلم الأطباء ولا تجربته ولا قياسه؛ وقد جَرَّبنا نحنُ وغيرنا من هذا أموراً كثيرة ورأيناها تفعل ما لا تفعل الأدوية الحسية!»

অর্থ: «এখানে এমন কিছু ওষুধ রয়েছে যা রোগ থেকে আরোগ্য দান করে, অথচ বড় বড় চিকিৎসকের বুদ্ধিও সেগুলোর সন্ধান পায়নি, তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অনুমান সেগুলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি — সেগুলো হলো হৃদয়গত ও আত্মিক ওষুধ: হৃদয়ের শক্তি, আল্লাহর ওপর তার নির্ভরতা ও তাওয়াক্কুল, তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণ, তাঁর সামনে নিজেকে বিছিয়ে দেওয়া ও ভেঙে পড়া, তাঁর কাছে বিনীত হওয়া, সদকা, দুআ, তাওবা ও ইস্তিগফার, সৃষ্টির প্রতি ইহসান, বিপন্নের সাহায্য এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্তের কষ্ট লাঘব করা। এই ওষুধগুলো বিভিন্ন ধর্ম ও মিল্লাতের জাতিগুলো পরখ করে দেখেছে, আর আরোগ্যের ক্ষেত্রে সেগুলোর এমন প্রভাব তারা পেয়েছে যেখানে সবচেয়ে বড় চিকিৎসকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা কিংবা অনুমান পৌঁছাতে পারে না। আমরা নিজেরাও এবং আমাদের ছাড়া অন্যরাও এ ধরনের বহু বিষয় পরখ করে দেখেছি এবং দেখেছি যে সেগুলো এমন কাজ করে, যা বস্তুগত ওষুধ করতে পারে না!»

তালিকাটি লক্ষ্য করুন — সদকা একা নয়

এই অনুচ্ছেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো — এখানে ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ একটা তালিকা দিচ্ছেন, একক কোনো আমলের কথা নয়। তালিকায় আছে:

  • তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা)
  • আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ ও বিনয়
  • সদকা
  • দুআ
  • তওবা ও ইস্তিগফার
  • ইহসান (সৃষ্টির প্রতি সদাচরণ)
  • বিপন্নের সাহায্য ও দুশ্চিন্তাগ্রস্তের কষ্ট লাঘব

সদকা এই তালিকার মাত্র একটি অংশ — সাতটি-আটটি আমলের একটি। "যা বড় চিকিৎসকের জ্ঞানও পৌঁছাতে পারে না" — এই বিস্ময়কর প্রভাবের কৃতিত্ব ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ দিচ্ছেন এই সামগ্রিক তালিকাটাকে একসাথে, শুধু সদকাকে একা নয়।

ইবনুল কাইয়িম আসলে কী দাবি করছেন

যদি কেউ এই পুরো অনুচ্ছেদ থেকে শুধু "সদকা" শব্দটা তুলে নিয়ে বলে — "ইবনুল কাইয়িম বলেছেন সদকা একাই এমন রোগ সারায় যা চিকিৎসকরা পারেন না" — তাহলে সেটা মূল বক্তব্যকে সংকুচিত করে ফেলা হবে। ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর প্রকৃত দাবি হলো: তাওয়াক্কুল + দুআ + তওবা + ইস্তিগফার + সদকা + ইহসান + বিপন্নের সাহায্য — এই সবগুলো একসাথে করলে এমন প্রভাব দেখা যায় যা একা কোনো একটি আমল দিয়ে দাবি করা হয়নি।

(এখানেও একটি ছোট স্বচ্ছতার নোট প্রয়োজন: এই উদ্ধৃতির শুরুর বাক্যাংশটি অক্ষরে-অক্ষরে ১০০% নিশ্চিত করা যায়নি — বিভিন্ন উৎসে সামান্য ভিন্ন ভাষ্য পাওয়া গেছে। তবে তালিকার আমলগুলো এবং শেষের বাক্য «ورأيناها تفعل ما لا تفعل الأدوية الحسية» একাধিক স্বতন্ত্র উৎসে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়েছে, এবং «যাদুল মাআদ ৪/১০-১১» হিসেবেই সবখানে উদ্ধৃত হয়। মূল বক্তব্য তাই নির্ভরযোগ্য, যদিও শব্দ-বিন্যাসের প্রতিটি অক্ষর কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রিত সংস্করণের পাতা খুলে সরাসরি মেলানো এই যাচাইয়ে সম্ভব হয়নি।)

এটা কি বইয়ের ভুল, নাকি প্রতারণা?

না, কোনোটাই না। বইটি দুটো উদ্ধৃতিই শব্দে শব্দে সঠিকভাবে তুলে ধরেছে — কোনো শব্দ বদলায়নি, কোনো কথা বানায়নি। যা ঘটেছে তা হলো একটা সাধারণ প্রবণতা যা বহু ইসলামী রচনাতেই দেখা যায়: একটি বিস্তৃত (broad) আলোচনা থেকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের (এখানে: শারীরিক রোগ) সমর্থনে একটি প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে আনা। এটি অসততা নয়, বরং প্রসঙ্গের সম্প্রসারণ (generalization) — যা যেকোনো পাঠক, দাঈ বা লেখকের কাছ থেকেই ঘটতে পারে, বিশেষত যখন উদ্ধৃতিটি ইতিমধ্যেই বহু জায়গায় এভাবেই প্রচলিত।

এই প্রেক্ষাপট জানার পর কী লাভ?

এই আসল প্রেক্ষাপট জানার পর ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর শিক্ষা ছোট হয়ে যায় না — বরং তা আরও সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের বলছেন না যে শুধু একটা কাজ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলছেন — একজন মানুষ যখন একসাথে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, দুআ করে, তওবা-ইস্তিগফার করে, সদকা দেয়, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে এবং বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে — তখন সেই সামগ্রিক জীবনযাপনের একটা প্রভাব তৈরি হয় যা কোনো একক আমল দিয়ে আশা করা যায় না।

সদকা এই বাস্কেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ, মূল্যবান উপাদান — কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। যে রোগী শুধু সদকা দিয়ে বসে থাকেন, কিন্তু দুআ, তওবা, ইস্তিগফার বা সৎকর্ম বাদ দেন, তিনি ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর প্রকৃত পরামর্শ থেকেই বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন।

ব্যবহারিক পরামর্শ

কেউ যদি এই সিরিজ পড়ে সদকাকে চিকিৎসার একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে চান, তাহলে ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করে নিচের সবগুলো একসাথে করার চেষ্টা করুন — শুধু একটাতে থেমে না গিয়ে:

  1. তাওয়াক্কুল — আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, চিকিৎসাও করা এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া।
  2. দুআ — নিয়মিত, একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে আরোগ্য প্রার্থনা।
  3. তওবা ও ইস্তিগফার — অতীতের গুনাহ থেকে ফিরে আসা ও ক্ষমা প্রার্থনা।
  4. সদকা — সাধ্যমতো নিয়মিত দান করা, বিশেষত রোগীর পক্ষ থেকে।
  5. ইহসান — মানুষের সাথে সদাচরণ।
  6. বিপন্নের সাহায্য — অন্যের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা।

উপসংহার

ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর দুটি উদ্ধৃতিই সত্য, শক্তিশালী এবং সদকার মূল্য প্রমাণ করে। কিন্তু প্রথমটি মূলত সাধারণ "বালা" প্রতিরোধ নিয়ে — যার একটি উদাহরণ মন্দ মৃত্যু, নির্দিষ্টভাবে রোগ নয় — আর দ্বিতীয়টি সদকাকে একা নয়, বরং ছয়-সাতটি আমলের একটি সমন্বিত তালিকার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। «সদকা দিয়ে চিকিৎসা» বইটি এই কথাগুলো সঠিকভাবেই উদ্ধৃত করেছে — শুধু প্রসঙ্গটা পুরোপুরি না দেখালে পাঠকের মনে একটা সংকীর্ণ ধারণা তৈরি হতে পারে। আসল প্রেক্ষাপট জানলে আমরা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর শিক্ষাকে আরও গভীরভাবে, আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।

তথ্যসূত্র

আলিমদের ব্যাখ্যা

আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব (পৃ. ৪৯-৫০):

  • ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ, «আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব মিনাল কালিমিত তাইয়িব», পৃ. ৪৯-৫০ (উদ্ধৃতির পাতা-নম্বর একাধিক অনলাইন উৎসে একই ভাবে উদ্ধৃত হয়েছে; তবে এই নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা-নম্বরটি ঠিক কোন প্রকাশনা-সংস্করণের তা এই যাচাইয়ে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা যায়নি — দারুল হাদীস সংস্করণে একই বাক্য পৃ. ৩১-এ পাওয়া যায়, যা দেখায় সংস্করণভেদে পৃষ্ঠা-নম্বর ভিন্ন হয়)।
  • অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ অনুযায়ী, উদ্ধৃতির অব্যবহিত পরেই তিরমিযীতে বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস আসে: «إن الصدقة تطفئ غضب الرب، وتدفع ميتة السوء» (নিশ্চয়ই সদকা রবের ক্রোধ নিভিয়ে দেয় ও মন্দ মৃত্যু প্রতিরোধ করে) — যা দেখায় আলোচনার মূল বিষয় সাধারণ "বালা" প্রতিরোধ, নির্দিষ্টভাবে রোগ-নিরাময় নয়।

যাদুল মাআদ (৪/১০-১১):

  • ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ, «যাদুল মাআদ ফী হাদয়ি খাইরিল ইবাদ», অত-তিব্বুন নববী (নববী চিকিৎসা) অধ্যায়, খণ্ড ৪, পৃ. ১০-১১ — হৃদয়গত ও আত্মিক ওষুধ (الأدوية القلبية والروحانية) সংক্রান্ত অংশ।
  • এই উদ্ধৃতিতে বর্ণিত আমলের তালিকা: তাওয়াক্কুল, আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ, সদকা, দুআ, তওবা, ইস্তিগফার, ইহসান, বিপন্নের সাহায্য ও দুশ্চিন্তাগ্রস্তের কষ্ট লাঘব — একাধিক স্বতন্ত্র উৎসে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিশ্চিত।

অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস

  • আবু উমামা বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস «দাওয়ূ মারদাকুম বিস-সদাকাহ» (তোমাদের রোগীদের সদকা দিয়ে চিকিৎসা করো) — আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাসান বলেছেন (সহীহুল জামি, নং ৩৩৫৮)।
  • বুখারী (১৪৩৫) ও মুসলিম (১৪৪) বর্ণিত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস — সিয়াম, সালাত, সদকা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ফিতনার কাফফারা হওয়া প্রসঙ্গে।
  • তিরমিযী বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস — সদকা মন্দ মৃত্যু প্রতিরোধ করা প্রসঙ্গে।

এই লেখাটি «من عجائب العلاج بالصدقة» গ্রন্থে উদ্ধৃত ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১০ মিনিট

সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা: একটি ভূমিকা ও পাঁচটি ভিন্ন দাবি

আপনি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময় শুনেছেন বা পড়েছেন — "সদকা দিয়ে রোগ ভালো হয়", "কিছু মানুষ ক্যান্সার থেকে সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছেন", "সদকা করো, আল্লাহ রোগ

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১২ মিনিট

«দাউউ মারদাকুম বিসসদকা» হাদীসটি কতটা সহীহ? — একটি সৎ যাচাই

«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি) বইটির একেবারে কেন্দ্রে আছে একটি হাদীস: «داووا مرضاكم بالصدقة» — "তোমাদের অসুস্থদের সদক

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১০ মিনিট

সদকা কি রুকইয়াহ বা ডাক্তারের বিকল্প?

গুরুতর অসুস্থ কারো পরিবারের একজন মানুষ যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন সবচেয়ে আগে যে কথাটা তার শোনা দরকার, সেটা দিয়েই শুরু করা যাক — স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ভাষায়