← সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা

সদকা

সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা: একটি ভূমিকা ও পাঁচটি ভিন্ন দাবি

আপনি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময় শুনেছেন বা পড়েছেন — "সদকা দিয়ে রোগ ভালো হয়", "কিছু মানুষ ক্যান্সার থেকে সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছেন", "সদকা করো, আল্লাহ রোগ

সদকারুকইয়াহহাদীস যাচাই
এই লেখায় যা আছে
  1. একটি বাক্য, অন্তত পাঁচটি দাবি
  2. প্রথম দাবি: ইসলাম সদকাকে উৎসাহিত করে
  3. দ্বিতীয় দাবি: সদকা সওয়াব ও কল্যাণের একটি মাধ্যম
  4. তৃতীয় দাবি: সদকা সাধারণভাবে বিপদ-আপদ দূর করে — আলিমদের শিক্ষা
  5. চতুর্থ দাবি: একটি নির্দিষ্ট হাদীস কি সরাসরি "সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করো" বলে?
  6. পঞ্চম দাবি: "আমি সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছি" — মানুষের বলা গল্প
  7. কেন এই পাঁচটি দাবি গুলিয়ে ফেলা বিপজ্জনক
  8. সামনে কী আসছে
  9. তথ্যসূত্র
  10. কুরআন
  11. হাদীস
  12. আলিমদের ব্যাখ্যা
  13. অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস

আপনি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময় শুনেছেন বা পড়েছেন — "সদকা দিয়ে রোগ ভালো হয়", "কিছু মানুষ ক্যান্সার থেকে সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছেন", "সদকা করো, আল্লাহ রোগ সারিয়ে দেবেন"। ফেসবুকে শেয়ার হওয়া পোস্ট, ইউটিউবের ছোট ক্লিপ, বা পরিচিত কারও মুখে — এই ধরনের কথা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কিছু মানুষ এতে গভীর প্রশান্তি পান, আবার কেউ কেউ সন্দিহান হন — এটা কি সত্যিই ইসলামের কথা, নাকি লোকমুখে ছড়ানো অতিরঞ্জন?

এই লেখাটি একটি পনেরো-পর্বের সিরিজের প্রথম পর্ব, যেখানে আমরা আরবি একটি গ্রন্থ — «সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি» (মূল আরবি: من عجائب العلاج بالصدقة) — এবং সেই সঙ্গে আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষার স্বাধীন গবেষণা যাচাই করে একটি সৎ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আজকের পর্বে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা হাদীসের গভীর বিশ্লেষণে যাচ্ছি না — বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বুনিয়াদি বিষয় স্পষ্ট করছি, যা না বুঝলে বাকি চৌদ্দটি পর্বও ভুল বোঝার ঝুঁকিতে পড়বে।

একটি বাক্য, অন্তত পাঁচটি দাবি

"সদকা দিয়ে রোগ ভালো হয়" — শুনতে এটি একটিমাত্র বাক্য, একটিমাত্র দাবি মনে হয়। কিন্তু আসলে এর ভেতরে অন্তত পাঁচটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি লুকিয়ে আছে, আর প্রতিটির প্রমাণের জোর আলাদা — কোনোটি পাথরের মতো মজবুত, কোনোটি বিতর্কিত, আর কোনোটি নিছক শোনা-কথা। এগুলোকে এক পাল্লায় মেপে ফেলাই সবচেয়ে বড় ভুল, আর এই ভুলটাই এই সিরিজের গবেষণা-পর্বে আমরা বারবার দেখেছি — বাংলা ভাষায় প্রচলিত লেখাগুলোতেও।

নিচে আমরা এই পাঁচটি দাবিকে আলাদা করে দেখাচ্ছি। এই ভাগ করাটা আমাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা-কাঠামো (একে "সম্পাদকীয় কাঠামো" বলাই ভালো) — এটি কোনো আলিমের নিজস্ব ভাগ নয়, বরং পাঠককে বুঝতে সাহায্য করার জন্য আমাদের প্রস্তাবিত পদ্ধতি। তবে প্রতিটি দাবির ভেতরের তথ্য — আয়াত, হাদীস, আলিমদের বক্তব্য — সরাসরি উৎস থেকে নেওয়া, কোথাও অনুমান বা মুখস্থ-স্মৃতি থেকে নয়।

প্রথম দাবি: ইসলাম সদকাকে উৎসাহিত করে

এটি সবচেয়ে মজবুত ভিত্তির দাবি — কুরআন ও হাদীসে বহু জায়গায় সরাসরি বলা আছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُمْ﴾<br>(ভাবার্থ: হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৪, আংশিক উদ্ধৃতি)

এখানে দান-সদকা করাকে সরাসরি ঈমানদারদের প্রতি নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই স্তরের দাবিতে কোনো মতভেদ নেই — ইসলাম সদকাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ও চরিত্র হিসেবে বারবার উৎসাহিত করেছে। এটি আমাদের গবেষণায় "লেভেল ১" — অর্থাৎ সরাসরি কুরআনের ভিত্তিতে দাঁড়ানো দাবি।

দ্বিতীয় দাবি: সদকা সওয়াব ও কল্যাণের একটি মাধ্যম

এটিও একইভাবে মজবুত — সহীহ হাদীসে সদকার সওয়াব ও উপকারিতার কথা স্পষ্ট। যেমন হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

( فتنة الرجل في أهله وماله ونفسه وولده وجاره ، يكفرها الصيام والصلاة والصدقة والأمر بالمعروف والنهي عن المنكر )<br>«মানুষের পরীক্ষা হয় তার পরিবার, সম্পদ, নিজের সত্তা, সন্তান ও প্রতিবেশীর ব্যাপারে; সিয়াম, সালাত, সদকা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ তার কাফফারা হয়ে যায়।» — বুখারী (১৪৩৫) ও মুসলিম (১৪৪)

এই হাদীসে সদকাকে সিয়াম-সালাতের সঙ্গে একই কাতারে রাখা হয়েছে — এমন একটি আমল হিসেবে, যা গুনাহর কাফফারা হয়ে যায়। এটিও "লেভেল ২" — সহীহ ও নিঃসংশয় হাদীসের ভিত্তিতে দাঁড়ানো দাবি। এখানেও কোনো বিতর্ক নেই।

তৃতীয় দাবি: সদকা সাধারণভাবে বিপদ-আপদ দূর করে — আলিমদের শিক্ষা

এখানে থেকেই বিষয়টা একটু জটিল হতে শুরু করে — যদিও এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত। ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ তাঁর «আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব» গ্রন্থে (পৃ. ৪৯-৫০) লিখেছেন:

( فإنَّ للصَّدَقة تأثيراً عجيباً في دفع أنواع البلاء ، ولو كانت مِن فاجر أو مِن ظالِم ، بل من كافر ! ، فإنَّ الله تعالى يدفع بها عنه أنواعاً من البلاء ؛ وهذا أمرٌ معلوم عنْدَ الناس خاصتهم وعامتهم ، وأهل الأرض كلهم مُقرُّون بـه لأنهم جرَّبوه )<br>«নিশ্চয়ই নানা রকম বালা-বিপদ দূর করার ব্যাপারে সদকার এক বিস্ময়কর প্রভাব রয়েছে — এমনকি সদকা যদি কোনো পাপাচারী বা যালিমের পক্ষ থেকেও হয়, বরং কোনো কাফিরের পক্ষ থেকেও হয়! কারণ আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা তার থেকে নানা রকম বালা দূর করে দেন। এ বিষয়টি মানুষের কাছে সুবিদিত — বিশেষ ও সাধারণ সবার কাছেই; পৃথিবীর সব মানুষই এ কথা স্বীকার করে, কারণ তারা এটি পরখ করে দেখেছে।»

আমাদের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরা পড়েছে, যা পাঠকের জানা দরকার: এই উদ্ধৃতিতে ইবনুল কাইয়িম রহ. সাধারণভাবে "বালা" (বিপদ-মুসিবত) দূর হওয়ার কথা বলছেন — নির্দিষ্টভাবে "রোগ" শব্দটি এখানে নেই। তাঁর «যাদুল মাআদ» গ্রন্থেও (৪/১০-১১) সদকার কথা একা নয়, বরং তাওয়াক্কুল, দুআ, তাওবা-ইস্তিগফার, সৃষ্টির প্রতি ইহসান, বিপন্নের সাহায্য — এই পুরো তালিকার একটি অংশ হিসেবে এসেছে। অর্থাৎ ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর শিক্ষা হলো "একগুচ্ছ আধ্যাত্মিক আমল মিলে যে প্রভাব ফেলে, তা চিকিৎসকের জ্ঞানেরও বাইরে" — এককভাবে "সদকা = রোগের ওষুধ" এই সমীকরণ তাঁর নিজের ভাষায় নেই। এই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি নিয়ে সিরিজের তৃতীয় পর্বে আলাদাভাবে আলোচনা হবে।

তাই এই দাবিটিকে আমরা বলছি "সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু রোগ-নির্দিষ্ট নয়" — একে আমরা "লেভেল ৩" বলছি: একটি সঠিক ও স্বীকৃত আলিমীয় অবস্থান, কিন্তু যতটা সাধারণভাবে বলা হয়েছে, ততটাই এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধ রাখা দরকার।

চতুর্থ দাবি: একটি নির্দিষ্ট হাদীস কি সরাসরি "সদকা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করো" বলে?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয় — এবং এই সিরিজের গবেষণায় এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। বইটিতে উদ্ধৃত কেন্দ্রীয় হাদীসটি হলো:

( داووا مرضاكم بالصدقة )<br>«তোমাদের রোগীদের সদকা দিয়ে চিকিৎসা করো।»

বইটি এই হাদীসকে আবু উমামা বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এবং শাইখ আলবানী রহ. কর্তৃক "হাসান" (গ্রহণযোগ্য) গ্রেড দেওয়া হাদীস হিসেবে উপস্থাপন করেছে (সহীহুল জামি, নং ৩৩৫৮)। এটি সত্য যে আলবানী রহ. এই সংক্ষিপ্ত বাক্যাংশটিকে "হাসান লিগাইরিহি" (অন্য সূত্রের সমর্থনে গ্রহণযোগ্য) বলে গ্রেড দিয়েছেন। কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয় — এটি একটি সত্যিকারের, নিষ্পত্তিহীন আলিমীয় মতভেদের বিষয়।

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনা দাইমা) স্পষ্টভাবে বলেছে — «الحديث المذكور غير صحيح» (উক্ত হাদীসটি সহীহ নয়)। ইবনুল জাওযী, ইবনুল কায়সারানী, আবু হাতিম আর-রাযী, হাইছামী ও বায়হাকী স্বয়ং — এই প্রত্যেকেই এই হাদীসের সনদে ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ এটি এমন নয় যে "সবাই একমত, কেবল দুর্বল একটা মত বাদে" — বরং এটি প্রকৃতপক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে একটি বাস্তব মতভেদ, যেখানে প্রত্যাখ্যানকারী পক্ষে একটি সরকারি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

এর পূর্ণাঙ্গ সনদ-বিশ্লেষণ — কোন কোন বর্ণনা-সূত্র কেন দুর্বল, আলবানী রহ.-এর গ্রেডিং আসলে কী বোঝায়, এবং কেন এটিকে "নিজের সঙ্গে দ্বিমত করা" বলাটাও ভুল — এই বিস্তারিত আলোচনা সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে «দাউউ মারদাকুম বিসসদকা» হাদীসটি কতটা সহীহ? — একটি সৎ যাচাই শিরোনামে আসছে। এখানে শুধু এতটুকু জেনে রাখুন: এই হাদীসকে "নিশ্চিতভাবে সহীহ" বলে উপস্থাপন করা ঠিক নয়, আবার একে সম্পূর্ণ বাতিল বলাও ঠিক নয় — এটি প্রকৃত অর্থেই একটি মুলতবি (open) প্রশ্ন, যেখানে সততার সঙ্গে দুই পক্ষের অবস্থানই জানা দরকার।

একটি ভালো খবর অবশ্য এখানেই আছে — আমাদের গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছে, এই নির্দিষ্ট হাদীসটি বিতর্কিত হলেও, "আরোগ্যের নিয়তে সদকা দেওয়া" চর্চাটি এই হাদীস ছাড়াই সদকার সাধারণ ফজিলতের ওপর দাঁড়িয়ে টিকে থাকে — যা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দাবির মজবুত ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ পুরো বইয়ের মূল বার্তাটির জন্য এই একটিমাত্র বিতর্কিত হাদীসের প্রয়োজন নেই।

পঞ্চম দাবি: "আমি সদকা দিয়ে সুস্থ হয়েছি" — মানুষের বলা গল্প

মূল বইটিতে অতীত ও বর্তমানের আঠারোটি ঘটনা সংকলিত আছে, যেগুলো সদকা দেওয়ার পর সুস্থতা লাভের কথা বলে। এই গল্পগুলো পড়তে গভীরভাবে হৃদয়স্পর্শী — এবং বইটির নিজস্ব ভাষাও অত্যন্ত আবেগঘন, রোগীর কষ্ট বোঝার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। কিন্তু একটি গল্প হৃদয়স্পর্শী হওয়া, আর সেটি প্রমাণ হওয়া — এই দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আমাদের যাচাই-প্রক্রিয়ায় আমরা এই আঠারোটি ঘটনার প্রতিটিকে স্বাধীনভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি। ফলাফল স্পষ্ট: এর মধ্যে মাত্র দুটি ঘটনা ক্লাসিক্যাল ইতিহাসগ্রন্থে (যেমন ইমাম যাহাবীর «সিয়ার আ'লামিন নুবালা») স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য হিসেবে পাওয়া গেছে — এই দুটি নিয়ে সিরিজের অষ্টম পর্বে আলাদা আলোচনা আছে। বাকি প্রায় সব ঘটনাই — হয় সম্পূর্ণ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির গল্প, নাম-পরিচয়হীন, তারিখ-স্থানহীন, অথবা কেবল সংকলকের নাম জানা যায় (মূল ঘটনার ব্যক্তি নয়)। উদাহরণস্বরূপ, বইয়ের একটি ঘটনায় বলা হয়েছে একজন রোগীর কিডনির অসুখ পরীক্ষায় সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছিল — কিন্তু এই ঘটনায় কোনো নাম, তারিখ, হাসপাতাল বা পরীক্ষার প্রতিবেদনের উল্লেখ নেই, ফলে এটিকে একটি প্রচলিত সাক্ষ্য হিসেবেই দেখতে হবে, চিকিৎসা-দলিল হিসেবে নয়।

এর মানে এই নয় যে এই মানুষগুলো মিথ্যা বলছেন — বরং এর মানে হলো, আমাদের হাতে যাচাই করার মতো কোনো উপায় নেই। এই স্তরের দাবিকে আমরা বলছি "সাক্ষ্য" (testimony), "প্রমাণ" (evidence) নয়। বাকি নয়টি অজ্ঞাতনামা ঘটনা কেন যাচাই করা গেল না, অথচ কেন সেগুলো তবুও গুরুত্বপূর্ণ রয়ে যায় — এই প্রশ্নের উত্তর সিরিজের একাদশ পর্বে বাকি নয়টি ঘটনা: কেন যাচাই করা গেল না, তবু কেন গুরুত্বপূর্ণ শিরোনামে বিস্তারিত আসছে।

কেন এই পাঁচটি দাবি গুলিয়ে ফেলা বিপজ্জনক

মূল বইয়ের ভূমিকায় লেখকরা এক রোগীকে সরাসরি সম্বোধন করে লিখেছেন — "নিশ্চিত থাকুন যে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দেবেন"। এই বাক্যটি বইয়ের নিজস্ব আন্তরিক, সহানুভূতিশীল ভাষার অংশ — একজন কষ্টে থাকা মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা, যা বোঝা যায় ও শ্রদ্ধার দাবি রাখে। কিন্তু আমাদের এই সিরিজের নীতি হলো — কোনো নিশ্চিত ফলাফলের প্রতিশ্রুতি না দেওয়া। সদকা একটি উত্তম আমল, আল্লাহর কাছে প্রিয়, আর আল্লাহ চাইলে এর মাধ্যমে যেকোনো কল্যাণ দিতে পারেন — কিন্তু "সদকা দিলেই রোগ সারবে" এই ধরনের নিশ্চয়তামূলক বাক্য কোনো সূত্রেই সমর্থিত নয়, এমনকি বইটির নিজস্ব হাদীস-উদ্ধৃতিও একে "নিশ্চিত" বলে না।

প্রথম ও দ্বিতীয় দাবিকে চতুর্থ দাবির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে যা হয় তা হলো — "সদকা উত্তম" এই নিরাপদ সত্য থেকে হঠাৎ "এই নির্দিষ্ট হাদীস অনুযায়ী রোগ সারবেই" এই ঝুঁকিপূর্ণ দাবিতে লাফ দেওয়া। আবার তৃতীয় দাবিকে চতুর্থ ও পঞ্চম দাবির সঙ্গে মিশিয়ে ফেললে ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর সতর্ক, সাধারণীকৃত শিক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা-প্রতিশ্রুতিতে পরিণত করা হয় — যা তিনি নিজে কখনো বলেননি। আমাদের স্বাধীন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাসিক্যাল আলিম আল-হালিমী রহ.-ও (ইংরেজি সূত্র মাসজিদ দারুসসালামের মাধ্যমে উদ্ধৃত) শতাব্দী আগে একই সতর্কতা দিয়েছিলেন — সদকা চিকিৎসার পরিপূরক হতে পারে, কখনো বিকল্প নয়; আল্লাহ ঠিক করে দিয়েছেন, চিকিৎসা নিলে সুস্থতা আসতে পারে, না নিলে রোগ বেড়েও যেতে পারে। এই বিষয়টি সিরিজের চতুর্থ পর্বে সদকা কি রুকইয়াহ বা ডাক্তারের বিকল্প? শিরোনামে বিস্তারিত আসছে।

সামনে কী আসছে

এই পাঁচ-স্তরের কাঠামোটি মনে রাখুন — কারণ পরবর্তী প্রতিটি পর্ব এই কাঠামোরই একেকটি অংশ খুলে দেখাবে: কেন্দ্রীয় হাদীসের সনদ-বিশ্লেষণ, ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর আসল প্রসঙ্গ, আঠারোটি ঘটনার প্রতিটির যাচাই-অবস্থা, এবং সবশেষে সম্পূর্ণ সূত্র-তালিকা। লক্ষ্য একটাই — সদকার প্রকৃত ফজিলতকে খাটো না করে, বরং একে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত রেখে, সঠিক জায়গায় বসানো।

তথ্যসূত্র

কুরআন

  • সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৪ (আংশিক) — ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُمْ﴾

হাদীস

  • আবু উমামা বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত — «দাউউ মারদাকুম বিসসদকা» — সহীহুল জামি, নং ৩৩৫৮ (আলবানী কর্তৃক "হাসান লিগাইরিহি" গ্রেডকৃত, তবে গ্রেডিং বিতর্কিত — বিস্তারিত ২য় পর্বে)
  • হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত (ফিতনার হাদীস) — বুখারী (১৪৩৫), মুসলিম (১৪৪)

আলিমদের ব্যাখ্যা

  • ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ, আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব, পৃ. ৪৯-৫০
  • ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ, যাদুল মাআদ, ৪/১০-১১
  • সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনা দাইমা), ফতোয়া নং ১৮৩৬৯ — «الحديث المذكور غير صحيح»
  • আল-হালিমী রহিমাহুল্লাহ (মাসজিদ দারুসসালাম-এর মাধ্যমে উদ্ধৃত) — সদকা ও চিকিৎসার সম্পর্ক প্রসঙ্গে

অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস

  • সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি (مِن عجائبِ العلاجِ بالصَّدَقة), একদল তালিবুল ইলম (সংকলন) — মূল আরবি বই ও এর বাংলা অনুবাদ
  • ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ার আ'লামিন নুবালা, ৮/৪০৭ (ইবনুল মুবারক-সংক্রান্ত ঘটনা, স্বাধীনভাবে বহু উৎসে যাচাইকৃত)
  • এই সিরিজের ভিত্তি-গবেষণা প্রতিবেদন (PHASE1) — ৮টি সমান্তরাল গবেষণা এজেন্ট দ্বারা আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা উৎস যাচাই, ২০২৬-০৯-২১

এই লেখাটি সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি (مِن عجائبِ العلاجِ بالصَّدَقة) গ্রন্থের আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। মূল গ্রন্থের লেখক: একদল তালিবুল ইলম (সংকলন)। এছাড়া এই লেখায় বইয়ের বাইরে আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষার স্বাধীন গবেষণা (ফতোয়া সংস্থার রায়, হাদীস-বিশারদদের মতামত ও একাধিক ভাষার নির্ভরযোগ্য উৎস) থেকে পাওয়া তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১২ মিনিট

«দাউউ মারদাকুম বিসসদকা» হাদীসটি কতটা সহীহ? — একটি সৎ যাচাই

«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকার মাধ্যমে চিকিৎসার বিস্ময়কর ঘটনাবলি) বইটির একেবারে কেন্দ্রে আছে একটি হাদীস: «داووا مرضاكم بالصدقة» — "তোমাদের অসুস্থদের সদক

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১০ মিনিট

ইবনুল কাইয়িম কি সত্যিই শুধু সদকার কথা বলেছিলেন?

«من عجائب العلاج بالصدقة» (সদকা দিয়ে চিকিৎসার বিস্ময়কর নিদর্শন) বইটিতে ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর দুটি খুবই পরিচিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে — একট

সদকা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ১০ মিনিট

সদকা কি রুকইয়াহ বা ডাক্তারের বিকল্প?

গুরুতর অসুস্থ কারো পরিবারের একজন মানুষ যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন সবচেয়ে আগে যে কথাটা তার শোনা দরকার, সেটা দিয়েই শুরু করা যাক — স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ভাষায়