بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
✦ ✦ ✦
প্রবন্ধ

বদনজর: কুরআন-সুন্নাহ কী বলে, আর আমরা কোথায় বাড়াবাড়ি করি

নজর লাগা সত্য — কিন্তু সব বিপদের নাম নজর নয়

✦ ✦ ✦
রাকী ফয়সাল আহমেদ সাবিত
আল কুরআন রুকইয়াহ হিলিং সেন্টার
Al Quranic Ruqyah Healing Center
পড়তে সময় লাগবে আনুমানিক ৭ মিনিট
বদনজর নিয়ে আমাদের সমাজে দুটো বাড়াবাড়ি পাশাপাশি চলে। একদল একে পুরোপুরি অস্বীকার করে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়। আরেক দল জ্বর-মাথাব্যথা থেকে শুরু করে ব্যবসার লোকসান পর্যন্ত সবকিছুতে নজর খোঁজে। দুটোই ভুল, এবং দ্বিতীয়টি বেশি ক্ষতি করে।

প্রথমে দলিল

নজর লাগা সত্য — এ ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীস দুই জায়গাতেই স্পষ্ট কথা আছে। সূরা ফালাকে আল্লাহ নিজেই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন।

সূরা আল-ফালাক : ৫
وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ ۝۵
এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
সূরা ফালাকের শেষ আয়াত — হিংসার অনিষ্ট থেকে আশ্রয়।

হিংসা আর নজর — এক জিনিস নয়

হাসাদ হলো অন্তরের অবস্থা: কারও নিয়ামত দেখে তা নষ্ট হওয়ার কামনা করা। নজর হলো তার প্রকাশ — দৃষ্টির মাধ্যমে সেই ক্ষতি পৌঁছে যাওয়া। একজন মানুষ হিংসা না করেও নজর লাগাতে পারে, নিছক মুগ্ধ হয়ে; আবার হিংসা পুষে রেখেও কিছু না বলে চুপ থাকতে পারে।

এ কারণেই সুন্নাহর প্রতিকারও দুই রকম। নিজের অন্তরকে হিংসা থেকে পরিষ্কার রাখা এক জিনিস, আর অন্যের নজর থেকে হিফাজত চাওয়া আরেক জিনিস। বেশিরভাগ মানুষ কেবল দ্বিতীয়টা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

সূরা আল-বাকারা : ১০৯
وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمٰنِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ ۖ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّىٰ يَأْتِىَ اللَّهُ بِأَمْرِهِۦ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ ۝۱۰۹
আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফের বানিয়ে দেয়। তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর (তারা এটা চায়)। যাক তোমরা আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা কর এবং উপেক্ষা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আহলে কিতাবের হিংসার কথা — অন্তরের হিংসা কীভাবে কাজ করে তার সরাসরি বর্ণনা।

লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না

হঠাৎ ক্লান্তি, ঘন ঘন হাই ওঠা, শরীর ভার লাগা, নতুন কিছু পাওয়ার পরপরই বিপদ — এগুলো নজরের সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে বলা হয়। কিন্তু ‘সম্ভাব্য’ শব্দটা জরুরি। এই প্রতিটি লক্ষণের সাধারণ শারীরিক কারণও থাকতে পারে — রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েড, ঘুমের অভাব, বিষণ্নতা।

একজন রাকীর কাছে যত রোগী আসেন, তাঁদের একটা বড় অংশের সমস্যা আসলে চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক বা মানসিক সমস্যা। রুকইয়াহ শুরু করার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা বাদ দেওয়া উচিত নয় — বরং দুটো পাশাপাশি চলবে।

সুন্নাহর প্রতিকার

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নজরের জন্য রুকইয়াহ করতে বলেছেন, এবং নিজেও করেছেন। সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ অবশ্য প্রতিকারের আগেই — সুন্দর কিছু দেখলে বরকতের দোয়া করা।

‘মাশাআল্লাহ, তাবারাকাল্লাহ’ বলা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি স্বীকৃতি যে নিয়ামত আল্লাহর দেওয়া, আর সেই স্বীকৃতিই হিংসার দরজা বন্ধ করে দেয়।

নিজের নিয়ামত প্রকাশের ব্যাপারেও সংযম রাখা সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সন্তানের ছবি, নতুন ঘর, ব্যবসার অগ্রগতি — সবকিছু সবার সামনে না আনাটা অবিশ্বাস নয়, সতর্কতা।

সূরা আল-কলম : ৫১
وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصٰرِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُۥ لَمَجْنُونٌ ۝۵۱
কাফেররা যখন কোরআন শুনে, তখন তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা যেন আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিবে এবং তারা বলেঃ সে তো একজন পাগল।
কাফিরদের দৃষ্টি দিয়ে রাসূল ﷺ-কে আঘাত করার চেষ্টার আয়াত — নজরের দলিল হিসেবে যা বহুল উদ্ধৃত।

যেখানে মানুষ সবচেয়ে বড় ভুলটা করে

নজর সন্দেহ হলে অনেকে নির্দিষ্ট কাউকে দোষারোপ শুরু করেন — প্রতিবেশী, আত্মীয়, সহকর্মী। এটি ভয়ানক ভুল। কে নজর দিয়েছে তা গায়েবের বিষয়, আর গায়েব কেবল আল্লাহ জানেন। সন্দেহের বশে কাউকে অভিযুক্ত করা অপবাদ, আর অপবাদ নিজেই একটি বড় গুনাহ।

দ্বিতীয় ভুল হলো ‘কে করেছে বলে দিন’ এমন কারও কাছে যাওয়া। যিনি গায়েবের খবর দেওয়ার দাবি করেন, তাঁর কাছে যাওয়াই নিষিদ্ধ — তাঁর কথা বিশ্বাস করা তো আরও গুরুতর। রুকইয়াহ মানে আল্লাহর কালাম দিয়ে চিকিৎসা, গোয়েন্দাগিরি নয়।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

নজর সত্য, কিন্তু নজরই সব নয়। কুরআনের আয়াত পড়ুন, বরকতের দোয়া করুন, নিজের অন্তরকেও হিংসা থেকে পরিষ্কার রাখুন — আর বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন। তিনিই হিফাজতকারী।
পুরো আয়াত সংকলনটি কোথায়: এই বিষয়ের সম্পূর্ণ আয়াতসেট — ৩৫ টি অংশ, প্রতিটির পাঠসংখ্যাসহ — আলাদা প্রোটোকল ডকুমেন্টে আছে: বদনজর ও হিংসার আয়াত
ওয়েবে পড়ুন · PDF ডাউনলোড
সেবা ও হাদিয়া:
নিজের সমস্যা কী — বদনজর, হাসাদ, সিহর নাকি অন্য কিছু — বুঝতে না পারলে মেসেজে লিখুন Diagnosis
রুকইয়াহ একটি শরয়ী চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়।