بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
✦ ✦ ✦
প্রবন্ধ

ওয়াসওয়াসা: শয়তানের কুমন্ত্রণা, নাকি চিকিৎসার বিষয়?

একই লক্ষণের দুটি ভিন্ন উৎস — আর দুটোরই আলাদা সমাধান

✦ ✦ ✦
রাকী ফয়সাল আহমেদ সাবিত
আল কুরআন রুকইয়াহ হিলিং সেন্টার
Al Quranic Ruqyah Healing Center
পড়তে সময় লাগবে আনুমানিক ৮ মিনিট
ওজু ঠিক হয়েছে কি না বারবার সন্দেহ। নামাজে কত রাকাত হলো মনে থাকে না। তালাক বা কুফরি কথা অনিচ্ছায় মাথায় ঘুরপাক খায়, আর সেই চিন্তার জন্যই মানুষটা নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকেন। এই অবস্থাকে আমরা এক নামে ‘ওয়াসওয়াসা’ বলি — কিন্তু এর পেছনে দুটো আলাদা জিনিস কাজ করতে পারে।

কুরআন যা বলেছে

কুমন্ত্রণাদাতার অস্তিত্ব কুরআনে স্বীকৃত এবং তার কাজের ধরনও বর্ণিত — সে অন্তরে ফিসফিস করে, তারপর সরে যায়।

সূরা আন-নাস : ১-৬
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ۝۱ مَلِكِ النَّاسِ ۝۲ إِلٰهِ النَّاسِ ۝۳ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ ۝۴ الَّذِى يُوَسْوِسُ فِى صُدُورِ النَّاسِ ۝۵ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ ۝۶
বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের মা’বুদের তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্নগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।
সূরা নাস — পুরো সূরাটিই কুমন্ত্রণাদাতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা।

সাহাবীরাও এই কষ্টে পড়েছিলেন

সাহাবীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলেছিলেন, আমাদের মনে এমন কথা আসে যা মুখে আনতেও আমরা ভয় পাই। তিনি বললেন: “তোমরা কি সত্যিই তা অনুভব করেছ?” তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন: “এটাই ইমানের স্পষ্ট প্রমাণ।” (মুসলিম ১৩২)

এই হাদীসটি বোঝার জন্য জরুরি। খারাপ চিন্তা আসাটা গুনাহ নয়; বরং সেই চিন্তায় কষ্ট পাওয়াটাই প্রমাণ করে অন্তরে ইমান আছে। শয়তান ভাঙা ঘরে ঢিল ছোড়ে না।

কখন এটি চিকিৎসার বিষয়

কিন্তু সব ওয়াসওয়াসা এক নয়। যখন সন্দেহ একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বারবার ফিরে আসে, যখন মানুষটি একই কাজ বারবার করতে বাধ্য বোধ করেন — বারবার ওজু, বারবার হাত ধোয়া, বারবার দরজা পরীক্ষা — তখন এটি অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের চেনা রূপ, যা একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা।

এখানে দুটো জিনিস একসাথে সত্য হতে পারে, এবং সাধারণত হয়। শয়তান দুর্বল জায়গায় আঘাত করে; আর মানসিক অসুস্থতা সেই দুর্বল জায়গা তৈরি করে দেয়। তাই রুকইয়াহ ও চিকিৎসা পরস্পরবিরোধী নয় — একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি ধরলে রোগীই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

শরীয়তের নির্দেশনা: তর্ক নয়, উপেক্ষা

ওয়াসওয়াসার বিরুদ্ধে শরীয়তের কৌশলটি চমকপ্রদ — যুক্তি দিয়ে হারানোর চেষ্টা নয়, বরং পাত্তা না দেওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এমন হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে এবং থেমে যেতে।

কারণ ওয়াসওয়াসা তর্কে জেতার জিনিস নয়। যত উত্তর দেবেন, তত নতুন প্রশ্ন আসবে। ‘আমানতু বিল্লাহ’ বলে প্রসঙ্গ বদলে ফেলাটাই সমাধান।

সন্দেহের ব্যাপারেও ফিকহের নিয়ম পরিষ্কার: নিশ্চিত জিনিস সন্দেহ দিয়ে বাতিল হয় না। ওজু করেছেন বলে নিশ্চিত জানেন — এরপর ভেঙেছে কি না সন্দেহ হলে ওজু আছেই ধরবেন। এই একটি নিয়ম মেনে চললেই অনেক কষ্ট কমে।

সূরা আর-রা'দ : ২৮
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ۝۲۸
যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।
আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয় — এই প্রোটোকলের কেন্দ্রীয় আয়াত।

কোথা থেকে শুরু

সকাল-সন্ধ্যার যিকির নিয়ম করে পড়া, ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী, আর দিনে অন্তত একবার সূরা নাস — এগুলো ছোট মনে হলেও ধারাবাহিকভাবে করলে পার্থক্য তৈরি করে।

সাথে ঘুম ঠিক করা, ক্যাফেইন কমানো এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া — এতে ইমানের কোনো ঘাটতি হয় না। রোগের চিকিৎসা করা সুন্নাহ।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

ওয়াসওয়াসা ক্লান্তিকর, কিন্তু এটি ইমান নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নয়। যিকির ধরে রাখুন, সন্দেহকে পাত্তা দেবেন না, আর প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিন। আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।
পুরো আয়াত সংকলনটি কোথায়: এই বিষয়ের সম্পূর্ণ আয়াতসেট — ১২ টি অংশ, প্রতিটির পাঠসংখ্যাসহ — আলাদা প্রোটোকল ডকুমেন্টে আছে: অন্তরের প্রশান্তির আয়াত
ওয়েবে পড়ুন · PDF ডাউনলোড
সেবা ও হাদিয়া:
নিজের সমস্যা কী — বদনজর, হাসাদ, সিহর নাকি অন্য কিছু — বুঝতে না পারলে মেসেজে লিখুন Diagnosis
রুকইয়াহ একটি শরয়ী চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়।